মওলিদুন্নবী (দ:)-এর উদযাপন ও অনুমতি (দ্বিতীয় অধ্যায়)

পোষ্টটি অন্যকে পড়ার সুযোগ করে দিতে শেয়ার করুন প্লিজ।

মূল: শায়খুল ইসলাম ড: মুহাম্মদ তাহিরুল কাদেরী

অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন

[Bengali translation of Shaykh Tahirul Qadri’s book “Mawlid al-Nabi: Celebration and Permissibility. Translator: Kazi Saifuddin Hossain]

[উৎসর্গ: পীর ও মোর্শেদ হযরতুল আল্লামা সৈয়দ এ, জেড, এম, সেহাবউদ্দীন খালেদ আল-কাদেরী আল-চিশ্তী (রহ:)-এর পুণ্যস্মৃতিতে…]

দ্বিতীয় অধ্যায়

আনন্দ ও বিষাদময় ঘটনার স্মরণে

বিশ্বনবী (দ:)-এর বেলাদত (অর্থাৎ, ধরাধামে শুভাগমন) ইতিহাসের সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনা। এই দিনেই বিশ্বজগতের প্রতি খোদার (অসীম) করুণা (মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এ ধরণীতলকে নিজ তাশরিফ তথা শুভাগমন দ্বারা আশীর্বাদধন্য করেন। খুশি প্রকাশের জন্যে এর চেয়ে শ্রেয়তর দিন অার কোনোটাই হতে পারে না। সুখ ও হতাশা, শান্তি ও শঙ্কা, আশা ও নিরাশা হচ্ছে মানব জীবনের সেসব দিক, যেগুলো ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক পর্যায়ে প্রত্যেকের মন-মানসিকতাকে রূপায়ন করে থাকে। মহান আল্লাহতা’লা তাঁর নেয়ামত বর্ষণের মাধ্যমে অতীতকালের জাতিগুলোকে সুখ-শান্তির ঐশ্বর্য দ্বারা সমৃদ্ধ করেছিলেন, আবার তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞ ও অবাধ্য হওয়ার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যাপারেও তিনি তাদেরকে সতর্ক করেছিলেন।

হেদায়াত তথা সত্য ও সঠিক পথের দিকে পরিচালিত হওয়ার বিষয়টি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতার সাথে সম্পৃক্ত। কোনো ব্যক্তির অন্তরে সততারূপী বীজ যতোক্ষণ না বেড়ে ওঠে, ততোক্ষণ তার যাবতীয় কর্ম ফলদায়ক হবে না। কিন্তু যখন কেউ আধ্যাত্মিক হাল তথা অবস্থাগুলো অর্জন করেন এবং তাঁর মন ও মগজ আলোকিত হয়, তখন হেদায়াতের জ্যোতি তাঁর প্রতি বিচ্ছুরিত হয়; আর এই নূর তথা জ্যোতি দ্বারা তিনি জীবনের যাত্রাপথ লম্বা লম্বা কদমে পার হয়ে যান।

এসব অবস্থা হতে উপকার পেতে হলে প্রত্যেককে স্বীকার করতে হবে যে এগুলোর উৎস তারই চেনাজানাদের সাথে সম্পর্কিত। পয়গম্বর এয়া’ক্বূব (আ:) পুত্রবিচ্ছেদের শোকে দৃষ্টিশক্তি হারান। আল্লাহতা’লার এই পয়গম্বর (ওই সময়) শোকে মূহ্যমান অবস্থায় ছিলেন। কিন্তু যখন (তাঁর পুত্র) পয়গম্বর ইউসূফ (আ:) নিজের জামাটি আপন পিতার চোখের ওপর রাখার জন্যে প্রেরণ করেন, তখন হযরত এয়াক্বূব (আ:)-এর শোক পরিণত হয় সুখে এবং তাঁর দৃষ্টিশক্তিও ফিরে আসে। এমতাবস্থায় তাঁর অবস্থা ধৈর্য হতে কৃতজ্ঞতায় রূপ নেয়। অতএব, এটা পরিস্ফুট যে, এ ঘটনা চেনাজানার সম্পর্কের মধ্যেই আবর্তিত হয়েছে। কেননা, জামাটি ছিল পয়গম্বর ইউসূফ (আ:)-এর সাথে সম্পর্কিত।
অনুরূপভাবে, আমাদের জীবনেও এমন অনেক ঘটনা ঘটে থাকে, যা ওই ধরনের সম্পর্ককে ঘিরে আবর্তিত। আমাদের ঘরে বিভিন্ন জিনিস বিরাজমান, যেগুলো পূর্ববর্তী প্রজন্ম পরম্পরায় আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে; এ ধরনের জিনিসকে শিল্পকর্ম হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে, যেগুলোকে এমন কি স্পর্শ করলেও স্মৃতির রোমন্থন হয়। একইভাবে, আমাদের আনন্দ-বেদনার অনুভূতিগুলো-ও ওই ধরনের চেনাজানার সাথে সম্পর্কিত, আর এসব চেনাজানা হতেই আমাদের অন্তস্থিত (আত্মিক) অবস্থাগুলোর উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটে থাকে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের আহাদীস তথা পবিত্র বাণীতে বহু বাস্তব ঘটনার বর্ণনা বিদ্যমান, যেগুলোতে মহানতম পয়গম্বর (দ:) নিজের অনুশীলিত কর্ম দ্বারাই এই উম্মতকে আনন্দ ও বেদনাময় অবস্থাগুলোর স্মরণার্থে ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর স্মৃতিচারণ শিক্ষা দিয়েছেন। আমরা যদি গভীরভাবে এসব ঘটনা সম্পর্কে চিন্তা করি, তাহলে দেখতে পাবো যে খুশিপূর্ণ ও বিষাদময় অবস্থাগুলো কোনো নির্দিষ্ট চেনাজানা কারোর সাথে সংশ্লিষ্টতারই ফসল, যা তাঁর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মহানবী (দ:)-এর হাদীসে উল্লেখিত এরকম কিছু ঘটনা নিচে দেয়া হলো:

২.১ পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর দিবসের স্মরণে

মহানবী (দ:) মদীনা মোনাওয়ারায় হিজরত করার পর সেখানে বসবাসরত ইহুদীদের তিনি ১০ই মহররম তারিখে তাদের রোযা রাখার কারণ জিজ্ঞেস করেন। তারা উত্তরে বলে, এই দিনে আল্লাহতা’লা ফেরাউনকে পানিতে ডুবিয়ে পয়গম্বর মূসা (আ:)-কে বিজয় দান করেন। ফেরাউনের দুঃশাসন ও অত্যাচার-নিপীড়ন হতে এ দিনেই ইসরাঈল জাতি মুক্তি লাভ করে। এই কারণে পয়গম্বর মূসা (আ:) আল্লাহতা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং দিনটিতে রোযা রাখেন। তাই আমরাও এ দিনে রোযা রাখি। রাসূলুল্লাহ (দ:) ইহুদীদের এই জবাব শুনে বলেন, আমি তোমাদের চেয়ে মূসা (আ:)-এর বেশি ঘনিষ্ঠ (দুই জনই আল্লাহর পয়গম্বর হওয়ার সূত্রে)। অতঃপর প্রিয়নবী (দ:)-ও ১০ই মহররম তারিখে নিজে রোযা রাখা আরম্ভ করেন এবং তাঁর সাহাবা (রা:)-বৃন্দকেও অনুরূপ রোযা পালন করতে আদেশ দেন। [আল-বুখারী রচিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-সওম’, ‘এয়াওমে আশুরার রোযা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৭০৪ #১৯০০; আল-বুখারী কৃত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-আম্বিয়া’, ‘আল্লাহর কালাম: মূসা (আ:)-এর সংবাদ তোমাদের কাছে পৌঁছেছে কি?’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১২৪৪ #৩২১৬; আল-বুখারী লিখিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব ফাযা’য়েল আল-সাহা’বা’, ‘মহানবী (দ:) মদীনায় এলে ইহুদীদের তাঁর কাছে আগমন’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১৪৩৪ #৩৭২৭; মুসলিম প্রণীত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-সিয়া’ম’, ‘এয়াওমে আশুরার রোযা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৭৯৫-৭৯৬ #১১৩০; আবূ দাউদ রচিত ‘আল-সুনান: কিতা’ব আল-সওম’, ‘এয়াওমে আশুরার রোযা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৩২৬ #২৪৪৪; ইবনে মা’জাহ কৃত ‘আল-সুনান: কিতা’ব আল-সিয়া’ম’, এয়াওমে আশুরার রোযা’ শীর্ষক অধ্যায়, ১:৫৫২ #১৭৩৪; আহমদ ইবনে হাম্বল লিখিত ‘আল-মুসনাদ’, ১:২৯১ ও ৩৩৬ #২৬৪৪ ও ৩১১২; এবং আবূ এয়া’লা’ রচিত ‘আল-মুসনাদ’, ৪:৪৪১ #২৫৬৭]

এ থেকে পরিস্ফুট হয় যে ইসরাঈল বংশ (তাদের) এই জাতীয় জীবনের ঘটনায় খুশি প্রকাশ করতে দিনটির স্মরণে রোখা রেখেছিল; আর মহানবী (দ:)-ও সেই ঘটনার ব্যাপারে তাঁর খুশি প্রকাশার্থে একইভাবে রোযা রেখে দিনটিকে স্মরণ করেন।

২.২ পয়গম্বর নূহ (আ:)-এর দিবসের স্মরণে

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (১৬৪-২৪১ হিজরী) ও হাফেয ইবনে হাজর আল-আসক্বালা’নী (৭৭৩-৮৫২ হিজরী) ‘এয়াওমে আশূরা’ (আশূরা দিবস) সম্পর্কে হযরত আবূ হোরায়রা (রা:) হতে এ মর্মে আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় বর্ণনা করেন যে, ওই দিনটিতে আল্লাহতা’লা পয়গম্বর নূহ (আ:) ও তাঁর সাথীদের প্রতিও নিজ অনুগ্রহ বর্ষণ করেন; কেননা ওই দিনেই তাঁরা কিস্তি থেকে ‘জূদী’ পর্বতশৃঙ্গে অবতরণ করেন। এরপর থেকে পয়গম্বর নূহ (আ:) ও তাঁর সাথীবৃন্দ আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং দিনটি পরবর্তী প্রজন্মগুলোর দ্বারা বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ দিবস হিসেবে পালিত হতে থাকে। এই দিনে মহানবী (দ:)-ও রোযা রাখেন এবং তাঁর সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-কেও রোযা রাখার নির্দেশ দেন। [আহমদ ইবনে হাম্বল কৃত ‘আল-মুসনাদ’, ২:৩৫৯-৩৬০ #৮৭০২; এবং আল-আসক্বালা’নী রচিত ‘ফাতহুল বারী’, ৪:২৪৭]

২.৩ ইসলাম-ধর্মের পূর্ণতাপ্রাপ্তির দিবস: খুশি উদযাপনের দিন (ঈদ)

হযরত কা’আব আল-আহবার (রা:) বর্ণনা করেন যে তিনি খলীফা হযরত উমর বিন আল-খাত্তা’ব (রা:)-কে বলেন, “আমি এমন এক জাতি সম্পর্কে জানি যাদের প্রতি এই আয়াতটি অবতীর্ণ হলে তারা ওই দিনটিকে (মানে আয়াত নাযেলের দিনটিকে) ঈদ হিসেবে উদযাপন করতো।” হযরত উমর ফারূক (রা:) জিজ্ঞেস করেন, “সেটা কোন্ আয়াত?” হযরত কা’আব (রা:) উত্তর দেন, “আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্যে ইসলামকে দ্বীন (পূর্ণাঙ্গ জীবন-ব্যবস্থা) মনোনীত করলাম।”[আল-ক্বুরআন, ৫:৩]

অতঃপর হযরত উমর (রা:) বলেন, “এই আয়াতটি  (‘আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম’) যেদিন নাযেল হয় সেদিনটি সম্পর্কে আমি জানি: সেদিনটি ছিল ‘আরাফা এবং শুক্রবার; আর উভয়-ই (ইতোমধ্যে) আমাদের জন্যে ঈদের দিনে পরিণত হয়েছে।” [আল-তাবারানী রচিত ‘আল-মু’জাম অাল-আওসাত’, ১:২৫৩ #৮৩০; আল-আসক্বালা’নী কৃত ‘ফাতহুল বারী’, ১:১০৫ #৪৫; এবং ইবনে কাসীর প্রণীত ‘আল-তাফসীর আল-ক্বুরআন আল-আযীম’, ২:১৪]

এখানে হযরত কা’আব (রা:)-ই তাঁর ভাবনাকে ভাষায় প্রকাশ করেন এ মর্মে যে, এই সুসংবাদ প্রাপ্তির দিনটিকে ঈদের দিন হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। আর হযরত উমর ফারূক (রা:)-ও তা অনুমোদন এবং এর সত্যতা প্রতিপাদন করেন। এ দৃষ্টান্ত থেকে এটা শেখা যায় যে আমাদের (অর্থাৎ, মুসলমানদের) জাতীয় ও সম্প্রদায়গত জীবনে এমন কিছু ঘটনা আছে, যেগুলোর তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব থাকায় সেগুলোকে ঈদের মতো করে উদযাপন করা উচিত। এ কাজটি ক্বুরআন ও সুন্নাহর নীতির পরিপন্থী নয়। বরঞ্চ তা একটি (শরীয়ত)-সমর্থিত পুণ্যদায়ক আমল, যেটা জাতীয় ও সম্প্রদায়গত দৃষ্টিকোণ হতে গুরুত্বপূর্ণ। [খুশি উদযাপনের ব্যাপারে আরো বিস্তারিত জানতে এই বইয়ের পঞ্চম অধ্যায় দেখুন]

২.৪ আল-হিজর অতিক্রমকালে মহানবী (দ:)-এর নির্দেশ

নবম হিজরী সালে তাবূকের যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার সময় মুসলমান বাহিনী দুটো কুয়ো অতিক্রম করেন, যেগুলো ইতিপূর্বে সামূদগোত্রের মালিকানাধীন ছিল। এই স্থানটি সম্পর্কে প্রিয়নবী (দ:) বলেছিলেন যে পয়গম্বর সালেহ (আ:)-এর জাতি এখানেই একটি মাদী উটকে হত্যা করেছিল, যার ফলে আল্লাহতা’লা তাদেরকে শাস্তি দেন। রাসূলুল্লাহ (দ:) তাঁর সাহাবা (রা:)-বৃন্দকে দুটো কুয়োর মধ্যে শুধু একটি হতে পানি সংগ্রহের অনুমতি দেন, যাতে তাঁদের চাহিদা মেটে; অপর কুয়োটি হতে পানি সংগ্রহ করতে তিনি তাঁদের বারণ করেন।

যে কুয়োটি হতে মহানবী (দ:) তাঁর পুণ্যাত্মা সাহাবা (রা:)-বৃন্দকে পানি সংগ্রহের নির্দেশ দেন, সেটা থেকেই ওই উটনী ইতিপূর্বে জলপান করতো। তার জন্যে পানি পানের দিন (আলাদাভাবে) বরাদ্দ থাকলেও সামূদ গোত্রের লোকেরা এটা বরদাশত্ করতে অক্ষম হয়ে উটনীকে পেশীতন্তু কেটে হত্যা করে।

(পয়গম্বর সালেহ আলাইহিস্ সালামের) ওই উটনীকে হত্যার এ ঘটনাটি ঘটেছিল বহু শতাব্দী আগে, আর নিঃসন্দেহে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ও সাহাবাবৃন্দ রাদ্বিয়াল্লাহু তা’লা আনহুমের সময়কাল নাগাদ সেই কুয়োটিরও পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল; কিন্তু এতদসত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (দ:) সেটাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। এই কুয়োটি পয়গম্বর সালেহ (আ:)-এর উটনীর সাথে সম্পর্কিত ছিল, আর এর আশীর্বাদসূত্রে প্রিয়নবী (দ:) তাঁর সাহাবাবৃন্দ (রা:)-কে এটা থেকে পানি সংগ্রহ করতে বলেন। পক্ষান্তরে, সামূদ গোত্রের লোকেরা অপর যে কুয়োটির পানি ব্যবহার করতো, মহানবী (দ:) নিজ সাহাবামণ্ডলী (রা:)-কে সেটার পানি ব্যবহার করতে বারণ করেন। কেননা, সামূদ গোত্র এরই সূত্রে আল্লাহর শাস্তির সতর্ক-বার্তা শুনতে পেয়েছিল। তাদের ওই বিশ্বাসঘাতকতার (উটনীকে হত্যা) দরুন আল্লাহ পাক তাদেরকে শাস্তি দেন এবং ফলশ্রুতিতে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এ বিষয়টি স্মরণে রেখেই হুযূর পূর নূর (দ:) সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-কে ওই কুয়োর পানি ব্যবহার করতে মানা করেন।

এই নিষেধাজ্ঞা জারির আগে পুণ্যবান সাহাবা (রা:)-বৃন্দের একটি দল নিজেদের অজ্ঞাতসারে ‘সামূদ’ গোত্রের ওই কুয়ো থেকে পানি ব্যবহার করেছিলেন। এই নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে শোনার পর তাঁরা রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর কাছে আরয করেন এই মর্মে যে তাঁরা নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে না জেনেই ইতোমধ্যে ওই পানি ব্যবহার করেছেন। প্রিয়নবী (দ:) তাঁদেরকে ওই পানি এবং তা দ্বারা রান্নাকৃত সমস্ত খাবার ফেলে দিয়ে উটনীর সাথে সম্পর্কিত কুয়ো হতে সংগৃহীত পানি ব্যবহার করতে নির্দেশ দেন।

এই ঘটনা সম্পর্কে আরো বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় নিম্নের আহাদীসগুলোতে:

২.৪.১ আল-হিজরে অবস্থিত সামুদের কুয়ো হতে পানি পানে নিষেধাজ্ঞা

হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা:) বর্ণনা করেন, তাবূক জ্বিহাদের সময় রাসূলুল্লাহ (দ:) আল-হিজর এলাকায় যাত্রাবিরতি করেন এবং তাঁর সাহাবা (রা:)-বৃন্দকে সেখানকার কুয়ো হতে পানি পান বা সংগ্রহ করতে মানা করেন। (কতিপয় সাহাবী) আরয করেন, ‘আমরা তা দিয়ে আটার কাই বানিয়েছি এবং (জন্তুর চামড়ানির্মিত) আমাদের পানির থলেগুলো-ও পূর্ণ করেছি।’ মহানবী (দ:) তাঁদেরকে আটার কাই ছুঁড়ে ফেলতে বলেন এবং কুয়োর পানিও ঢেলে ফেলে দিতে আদেশ করেন। [আল-বুখারী প্রণীত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-আম্বিয়া’, ‘আল্লাহর বাণী: আর সামূদের প্রতি তাদের ভাই সালেহ’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১২৩৬-১২৩৭ #৩১৯৮; আল-ক্বুরতুবী কৃত ‘আল-জামে’ লি-আহকা’মিল ক্বুরআন’, ১০:৪৬; আল-বাগ্বভী রচিত ‘মু’আলিমুত্ তানযীল’, ২:১৭৮; ইবনে হাযম লিখিত ‘আল-মুহাল্লা’, ১:২২০; এবং আল-আসক্বালানী প্রণীত ‘তাগলীক্ব আল-তা’লীক্ব’, ৪:১৯]

২.৪.২ পয়গম্বর সালেহ (আ:)-এর মাদী উটের সাথে সংশ্লিষ্ট কুয়ো হতে জলপানসম্পর্কিত আদেশ

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা:) বর্ণনা করেন যে (সামূদ গোত্রের অধ্যুষিত) আল-হিজর এলাকায়  হুযূর পাক (দ:)-এর সাথে গমনকারী কিছু মানুষ সেখানকার কুয়ো থেকে পানি সংগ্রহ করে তা দ্বারা আটার কাই বানান এবং নিজেদের পানির থলেগুলো পূর্ণ করেন। মহানবী (দ:) তাঁর সাহাবাবৃন্দ (রা:)-কে ওই কুয়োর পানি ঢেলে ফেলে দিতে বলেন এবং আটার কাই তাঁদের উটগুলোকে খেতে দিতে আদেশ করেন। আর তিনি (পয়গম্বর সালেহ আলাইহিস্ সালামের) উটনী যে কুয়ো থেকে পানি পান করতো, তা হতে পানি সংগ্রহ করতে বলেন। [আল-বুখারী কৃত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব অাল-আম্বিয়া’, ‘আল্লাহর বাণী: আর সামূদের প্রতি তাদের ভাই সালেহ’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১২৩৭ #৩১৯৯; মুসলিম রচিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-যুহদ’, ‘নিজেদের (আত্মার) প্রতি যুলূমকারীদের বসতিতে প্রবেশ করো না’ শীর্ষক অধ্যায়, ৪:২২৮৬ #২৯৮১; ইবনে হিব্বা’ন লিখিত ‘আল-সহীহ, ১৪:৮২ #৬২০২; আল-বায়হাক্কী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ১:২৩৫ #১০৫০; এবং আল-ক্বুরতুবী কৃত ‘আল-জামে’ লি-আহকা’ম আল-ক্বুরআন’, ১০:৪৬]

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা:) বর্ণনা করেন যে তাবূকের যুদ্ধের বছর মুসলিম সেনাবাহিনী ‘সামূদ’ গোত্রের বসতির ধ্বংসাবশেষের পাশে তাঁবু ফেলেন। তাঁরা নিজেদের পাত্র সেখানকার কুয়োর পানি দ্বারা পূর্ণ করেন এবং আটার কাই বানান, আর গোশত-ও রান্না করেন। রাসূলুল্লাহ (দ:) (এ সম্পর্কে জানতে পেরে) তাঁদেরকে ওই পানি ফেলে দিতে বলেন; আর তাঁরাও পানি ফেলে দেন এবং আটা নিজেদের উটগুলোকে খাওয়ান। অতঃপর হুযূর পাক (দ:) তাঁদেরকে (পয়গম্বর সালেহ আলাইহিস সালামের) ওই উটনী যে কুয়ো হতে জলপান করতো, সেখানে নিয়ে যান। তিনি তাঁদেরকে (সামূদ গোত্রের) শাস্তিপ্রাপ্ত সেসব লোকের বসতভিটায় প্রবেশ করতে মানা করে বলেন, ‘আমি আশঙ্কা করি যে তাদেরকে যে শাস্তি আক্রান্ত করেছে, তা তোমাদেরকেও আক্রান্ত করতে পারে। অতএব, ওদের ঘরে প্রবেশ করো না।’ [আহমদ ইবনে হাম্বল রচিত ‘আল-মুসনাদ’, ২:১১৭ #৫৯৮৪; এবং ইবনে হিব্বা’ন প্রণীত ‘আল-সহীহ’, ১৪:৮৩ #৬২০৩; ইমাম আহমদ (রা:)-এর বর্ণনা সর্ব-ইমাম বুখারী (রহ:) ও মুসলিম (রহ:)-এর আরোপিত শর্ত পূরণ করেছে]

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, শরীয়তের দৃৃষ্টিতে কুয়োর ওই পানি স্বতন্ত্রভাবে ব্যবহারের অনুপযোগী ছিল না, বরং সুপেয় জল ছিল। কিন্তু (পয়গম্বর সালেহ আলাইহিস্ সালামের) উটনী হত্যার দায়ে (ঐশী) শান্তিপ্রাপ্ত গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কিত হওয়ার একমাত্র কারণেই প্রিয়নবী (দ:) তাঁর সাহাবা (রা:)-বৃন্দকে তা ব্যবহার করতে বারণ করেন। এরই বিপরীতে অপর কুয়োটি পয়গম্বর সালেহ (আ:)-এর উটনীর সাথে সম্পর্কিত ছিল। আর এই সম্পর্কের সূত্রেই কুয়োটিকে সম্মান দেয়া হয় এবং সেটাকে (ঐশী) করুণা ও আশীর্বাদের উৎস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। [বঙ্গানুবাদকের জরুরি জ্ঞাতব্য: লা’নতপ্রাপ্ত তথা অভিশপ্ত গোষ্ঠীর সাথে ওঠা-বসা, নামায-সমাজ ইত্যাদি বজায় রাখাও মুসলমানদের জন্যে এই দলিলে নিষিদ্ধ প্রমাণিত হয়। এব্যাপারে উদাসীনতা পতনের কারণ হবে।]

২.৪.৩ পয়গম্বর সালেহ (আ:)-এর মাদী উটের স্মরণে

ওপরে উল্লেখিত বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান করে যে কোনো নবী (আ:) বা রাসূল (আ:)-এর সাথে সম্পর্কিত আশীর্বাদ স্থায়ী প্রভাব ফেলে। সেগুলোকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা এবং সেগুলো হতে বরকত তথা আশীর্বাদ গ্রহণ করা এমনই এক শিক্ষা যা স্বয়ং মহানবী (দ:) প্রদান করেছেন। এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় বিষয় হলো আলোচ্য কুয়োটি সে-ই কুয়ো, যেটা থেকে পয়গম্বর সালেহ (আ:)-এর মাদী উটটি পানি পান করতো; কিন্তু পয়গম্বর সালেহ (আ:) তা থেকে পানি পান করেছিলেন বলে উল্লেখিত হয়নি।

অতঃপর সহস্র সহস্র বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, আর আল্লাহ-ই ভালো জানেন ওই সময় হতে পানির কতোটুকু পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, অথবা উটনীর পানকৃত জল এখনো আগের মতোই আছে কি না। তবে একমাত্র নিশ্চিত বিষয় হচ্ছে আল্লাহতা’লার আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের মধ্যে একজনের মালিকানাধীন উটনীর সাথে কুয়োটির সংশ্লিষ্টতা। এই সংশ্লিষ্টতাকে এতোই উচ্চমর্যাদার দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে যে দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও কুয়োর পানিকে শ্রদ্ধা করা হয়েছে এবং এর আশীর্বাদ-ও বহাল আছে।

২.৪.৪ সামূদের প্রতি বিধানকৃত শাস্তি স্মরণকালে দুঃখ প্রকাশ

সামূদ গোত্র কর্তৃক পৃথিবীর বুকে সর্বশেষ হাঁটার সময় হতে এ যাবত দীর্ঘকাল অতিবাহিত হয়েছে। এখন তাদের অার লেশচিহ্ন মাত্রও অবশিষ্ট নেই। যে বদনসিব তাদের আক্রান্ত করেছিল, তা-ও বর্তমানে দূর-অতীত। তথাপি রাসূলুল্লাহ (দ:) তাঁর পুণ্যবান সাহাবাবৃন্দ (রা:)-কে তাদের বসতভিটায় প্রবেশ করতে বারণ করেছিলেন এবং আরো আদেশ করেছিলেন যেন তাঁরা ওই ধ্বংসাবশেষ অতিক্রমের সময় দুঃখভারাক্রান্ত চিত্তে ও অশ্রুসজল নয়নে তা পার হন, যাতে মনে হয় শাস্তি এখনো তাঁদের ওপর পড়ছে।

হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা:) উদ্ধৃত করেন মহানবী (দ:)-কে, যিনি এরশাদ ফরমান: যারা নিজেদের (আত্মার) প্রতি যুলূম করেছিল, তাদের বসতিতে অশ্রুসিক্ত (ও বেদনার্ত) অবস্থা ছাড়া প্রবেশ করো না, পাছে তোমাদের প্রতিও অনুরূপ শাস্তি এসে পড়ে। [আল-বুখারী রচিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-আম্বিয়া’, ‘আল্লাহর বাণী: আর সামূদের প্রতি তাদের ভাই সালেহ’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১২৩৭ #৩২০০-৩২০১; মুসলিম কৃত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-যুহদ’, ‘যারা নিজেদের প্রতি যুলূম করেছে তাদের বসতিতে প্রবেশ করো না’ শীর্ষক অধ্যায়, ৪:২২৮৫-২২৮৬ #২৯৮০; আহমদ ইবানে হাম্বল প্রণীত ‘আল-মুসনাদ’, ২:৯৬; ইবনে হিব্বান কৃত ‘আল-সহীহ’, ১৪:৮০ #৬১৯৯; এবং আল-রূইয়্যা’নী রচিত ‘আল-মুসনাদ’, ২:৪০৭ #১৪০৯]

এই হতভাগ্য সম্প্রদায়ের ব্যাপারে বিশ্বনবী (দ:)-এর নির্দেশ ছিল এ মর্মে যে, দুঃখভারাক্রান্ত চিত্তে ও অশ্রুসিক্ত নয়নে  তাদের ধ্বংসাবশেষ অতিক্রম করতে হবে। সর্বাধিক করুণাময় রাসূল (দ:) তাঁর পুণ্যবান সাহাবাবৃন্দের (রা:) মাধ্যমে এই উম্মতকে এটা  শিক্ষা দিয়েছেন যেন আমরা যখন বিলীন জাতিগোষ্ঠীগুলোর ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর কথা স্মরণ করবো, তখন আল্লাহর প্রতি এমন বিনয় প্রকাশ করবো যাতে ওই জাতিগোষ্ঠী যেভাবে খোদায়ী শাস্তি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল সেভাবে আমরাও আক্রান্ত না হই। যদিও দৃশতঃ (সাহাবা-মণ্ডলীর মাঝে) মহানবী (দ:)-এর সম্মানিত উপস্থিতি এধরনের (আযাবের) ঘটনা রহিত করার অসীলাস্বরূপ, তবু তাঁদেরকেও দুঃখ-বেদনাময় ভাবাপ্লুত হতে বলা হয়েছে। এই হাদীস হতে আমরা এ শিক্ষা-ই পেয়েছি।

এই বিষয়টি অন্তর ও আত্মার অনুভূতি ও আবেগের সাথে সম্পৃক্ত। ইমাম মুসলিম (রহ:) ওপরে বর্ণিত এ হাদীসটি তাঁর ‘আল-সহীহ’ গ্রন্থের ‘কিতাব আল-রাক্বা’য়েক্ব’ (আত্ম-অস্বীকৃতি ও অন্তর কোমলকরণ) শীর্ষক বইয়ে উদ্ধৃত করেন। ইমাম সাহেব (রহ:) চেয়েছেন এই বার্তা পৌঁছে দিতে যে বিষয়টি ওইসব আমল (পুণ্যদায়ক কাজ) ও অনুশীলনের সাথে সম্পর্কিত, যেগুলো কারো অন্তর ও আত্মার ওপর আধ্যাত্মিক প্রভাব ফেলে। এধরনের ঐতিহাসিক ঘটনা উল্লেখ করার মাধ্যমে কারো অন্তস্তলে বিশেষ এক অনুভূতি বা আবেগ সৃষ্টি হয়, যার ফলে সে আধ্যাত্মিক পর্যায়ে তার জীবনে পরিবর্তন নিয়ে আসে। কারো আত্মার মনস্তাত্ত্বিক বা আধ্যাত্মিক উপকার যদি এতে নিহিত না থাকতো, তাহলে সর্বাধিক দয়াশীল রাসূলুল্লাহ (দ:) কেন তাঁর সাহাবায়ে কেরাম (রা:)-কে পুনরায় ওই অভিজ্ঞতা পেতে নির্দেশনা দানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতেন? তাঁদের আত্মিক হাল তথা অবস্থার পরিশুদ্ধি বা উন্নতিতে প্রভাব ফেলে না এমন কোনো কাজ করতে তো তিনি তাঁদেরকে আদেশ দিতে পারতেন না। তিনি তাঁদেরকে এটা করতে নির্দেশ দেয়ার বাস্তবতা-ই প্রমাণ করে যে এসব অবস্থা ব্যতিক্রমহীনভাবে প্রভাব ফেলে থাকে।

হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা:) বর্ণনা করেন মহানবী (দ:)-এর হাদীস, যিনি এরশাদ ফরমান: এসব (খোদায়ী) শাস্তিপ্রাপ্ত লোকদের বসতিতে অশ্রুসিক্ত অবস্থা ছাড়া প্রবেশ করো না। অশ্রুসজল না হতে পারলে তাতে প্রবেশ করো না, যাতে অনুরূপ অভিসম্পাত তোমাদের ওপর এসে না পড়ে। [আল-বুখারী লিখিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-মাসা’জিদ’, ‘শাস্তির এলাকায় নামায’ শীর্ষক অধ্যায়, ১:১৬৭ #৪২৩; আল-বুখারী কৃত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-মাগা’যী’, ‘আল-হিজর এলাকায় মহানবী (দ:)-এর শিবির স্থাপন’ শীর্ষক অধ্যায়, ৪:১৬০৯ #৪১৫৮; মুসলিম রচিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-যুহদ’, ‘যারা নিজেদের প্রতি যুলূম করেছে তাদের বসতিতে প্রবেশ করো না’ শীর্ষক অধ্যায়, ৪:২২৮৫ #২৯৮০; আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ২:৪৫১; এবং আবদ বিন হুমায়দ লিখিত ‘আল-মুসনাদ’, ১:২৫৫ #৭৯৮]

প্রিয়নবী (দ:) তাঁর সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-কে সামূদ গোত্রের লোকদের বসতভিটায় প্রবেশ করতে এমনভাবে মানা করেন যেন তারা এখনো সেখানে জীবিতাবস্থায় আছে। এটা এ কারণে যে, (পয়গম্বর সালেহ আলাইহিস্ সালামের) মাদী উটকে হত্যা করার অপরাধে আল্লাহতা’লা তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করেন। যদিও এ ঘটনা দীর্ঘকাল আগে ঘটেছিল, তবুও সর্বাধিক দয়াবান রাসূল (দ:)-ই এখানে খোদায়ী প্রতিবিধানের কথা স্মরণ করানোর জন্যে এবং প্রত্যেকের অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভয় সৃষ্টির লক্ষ্যে নির্দেশ প্রদান করেছেন।

মহাসম্মানিত নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) তাঁর পুণ্যবান সাহাবা (রা:)-মণ্ডলীকে আদেশ করেন যেন তাঁদের চোখের সামনে আল্লাহর শাস্তি ভেসে ওঠে, যাতে ওই ধ্বংসাবশেষ অতিক্রমকালে তাঁদের অন্তরে আল্লাহর শাস্তি পতিত হওয়ার ভীতির দরুন তাঁদের কান্না আসে। আর এটা তাঁরা না করতে পারলে তাঁদেরকে ওই উপত্যকায় প্রবেশ করতেই বারণ করা হয়। কতিপয় সাহাবা (রা:) হুযূর পূর নূর (দ:)-এর কাছে আরয করেন এই মর্মে যে তাঁরা যদি বেদনায় অশ্রুসজল না হতে পারেন, তাহলে তাঁরা কী করবেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা:) সাহাবামণ্ডলী (রা:)-এর এই আর্জির পরিপ্রেক্ষিতে মহানবী (দ:)-এর উত্তর বর্ণনা করেন এভাবে: তোমরা কাঁদতে না পারলে কান্নাকাটি করার চেষ্টা করো এ আশঙ্কায় যে তাদের প্রতি পতিত শাস্তি তোমাদের প্রতিও পতিত হতে পারে। [ইবনে কাসীর রচিত ‘আল-বেদা’য়া ওয়াল-নেহা’য়া’, ১:১৩৮; ইবনে কাসীর কৃত ’আল-তাফসীর আল-ক্বুরআ’ন আল-আযীম’, ২:৫৫৭; এবং আল-আসক্বালা’নী প্রণীত ‘ফাতহুল বা’রী’, ৬:৩৮০]

কান্নাকাটি করা শ্রেয়তর; কিন্তু কেউ তা না পারলে তার উচিত যে ব্যক্তি এটা পেরেছে, তাকে অনুকরণ করা। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহতা’লার শাস্তির কথা চিন্তা করে মানুষ যেন খোদাভীরুতা অর্জন করে, এবং এরই ফলে মহান প্রভুর প্রতি বিনয়ী হয় এবং তাঁরই আশ্রয় প্রার্থনা করে। এই ঘটনা বহুকাল আগে ঘটেছিল এবং এর মুহূর্তগুলোও অতিবাহিত হয়েছে। এতদসত্ত্বেও প্রিয়নবী (দ:) তাঁর পুতঃপবিত্র সাহাবাবৃন্দ (রা:)-কে সাথে নিয়ে এই ঘটনার স্মৃতি রোমন্থনের মাধ্যমে একে জীবন্ত করে রেখেছেন।

২.৪.৫ আল-হিজর অতিক্রমকালে মহানবী (দ:)-এর নিজস্ব আমল

সামূদ গোত্রের বসতি অতিক্রমকালে সৃষ্টিকুল শিরোমণি মহানবী (দ:) আপন চলার গতি বাড়িয়ে দেন, আর আপন চাদর দ্বারা নিজেকে আচ্ছাদিত করেন এমনভাবে যেন (খোদায়ী) শাস্তি বুঝি ওই সময়েও পতিত হচ্ছিল।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা:) বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ (দ:) তাঁর সওয়ারের জন্তুর ওপর বসা অবস্থাতেই আপন চাদর দ্বারা নিজেকে আবৃত করেন। [আল-বুখারী প্রণীত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-আম্বিয়া’, ‘আল্লাহর বাণী: আর সামূদের প্রতি তাদের ভাই সালেহ’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১২৩৭ #৩২০০; আহমদ ইবনে হাম্বল কৃত ‘আল-মুসনাদ’, ২:৬৬; আল-নাসাঈ রচিত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৬:৩৭৩ #১১,২৭০; এবং ইবনে মুবারক লিখিত ‘আল-যুহদ’, পৃষ্ঠা নং ৫৪৩ #১৫৫৬]

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা:) আরো বর্ণনা করেন: মহানবী (দ:) আল-হিজর অতিক্রম করার সময় বলেন, “যারা নিজেদের প্রতি যুলূম করেছে, তাদের বসতিতে তোমরা প্রবেশ করো না, পাছে তোমাদের ওপরও ওই শাস্তি পতিত হয়। বরঞ্চ তোমরা তাদেরকে অতিক্রম করো কান্নারত অবস্থায়।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (দ:) তাঁর শির মোবারক ঢেকে দ্রুতবেগে সেই স্থান পার হয়ে যান। [আল-বুখারী রচিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-মাগা’যী’, ‘আল-হিজরে মহানবী (দ:)-এর সেনাশিবির’ শীর্ষক অধ্যায়, ৪:১৬০৯ #৪১৫৭; মুসলিম কৃত ‘আল-সহীহ’: কিতা’ব আল-যুহদ’, ‘যারা নিজেদের প্রতি যুলূম করেছে তাদের বসতিতে প্রবেশ করো না’ শীর্ষক অধ্যায়, ৪:২২৮৬ #২৯৮০; আবদুর রাযযাক্ব প্রণীত ‘আল-মুসান্নাফ’, ১:৪১৫ #১৬২৪; এবং আল-বায়হাক্বী লিখিত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ২:৪৫১]

প্রিয়নবী (দ:) কর্তৃক উক্ত উপত্যকা দ্রুত অতিক্রম করার সময় নিজ শির মোবারককে ঢেকে রাখা এবং এর পাশাপাশি তাঁর পুণ্যবান সাহাবাবৃন্দ (রা:)-কে কান্নারত অবস্থায় এলাকাটি পার হতে বলাটা এমন এক আমল, যা’তে নিহিত  রয়েছে আমাদের জন্যে গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা।

২.৪.৫.১ বিবেচনাযোগ্য বিষয়াবলী  

এসব হাদীসের আলোকে নিম্নের সিদ্ধান্তগুলো নেয়া যায়:

প্রথমতঃ আমাদের মনে রাখতে হবে যে সর্বসেরা আধ্যাত্মিক ক্ষমতাবান নবী করীম (দ:)-এর উপস্থিতি-ই আল্লাহতা’লার করুণার এক উৎস এবং তাঁর গযব (রোষ/অসন্তুষ্টি) ও আযাব (শাস্তি) নিরোধক। অতএব, প্রিয়নবী (দ:) সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-এর মাঝে স্বশরীরে উপস্থিত থাকা অবস্থায় শাস্তি পতিত হওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা ছিল না। উপরন্তু, ওই সেনা অভিযানে শরীক হয়েছিলেন হুযূর পাক (দ:)-এর পুণ্যবান সাহাবীবৃন্দ (রা:), যাঁদের মধ্যে একজনও বে-ঈমান ছিলেন না, আল্লাহ মাফ করুন। ইতিহাসজুড়ে এর চেয়ে শ্রেয়তর সঙ্গি-সাথী পৃথিবীর বুকে আর কেউই ছিলেন না। এরকম মহান ব্যক্তিত্বদের প্রতি আল্লাহতা’লা শাস্তির বিধান করবেন, এ কথা কি চিন্তাও করা যায়?

ওই সময় সামূদ গোত্রের লোকেরা, যারা মাদী উটের পেশীতন্তু কেটে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ করেছিল, তারা আর জীবিত ছিল না। এতদসত্ত্বেও সবচেয়ে দয়াবান মহানবী (দ:) তাঁর পুতঃপবিত্র সাহাবা (রা:)-বৃন্দকে এ মর্মে উপদেশ দেন যেন তাঁরা শাস্তি পতিত হওয়ার ঘটনাটি কল্পনা করেন এবং তাঁদের অন্তর ও মস্তিষ্কে এর ভয় ও আশঙ্কার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। এর ফলে প্রত্যেক সাহাবী (রা:)-ই প্রচুর কান্নাকাটি করেন এবং এই বিবেকের দংশন অনুভব করেন যে শাস্তি প্রকৃতপক্ষে তৎক্ষণাৎ পতিত হতে যাচ্ছে।

দ্বিতীয়তঃ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সেনা অভিযানে মহান সাহাবী (রা:)-বৃন্দ একা ছিলেন না, তাঁদের সাথে উপস্থিত ছিলেন সৃষ্টিকুল শিরোমণি, মহাসম্মানিত পয়গম্বর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) স্বয়ং। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান: “এবং আল্লাহর কাজ এ নয় যে তাদেরকে শাস্তি দেবেন যতোক্ষণ পর্যন্ত হে মাহবূব, আপনি তাদের মধ্যে উপস্থিত থাকবেন।” [আল-ক্বুরআ’ন, ৮:৩৩; মুফতী আহমদ এয়ার খাঁন সাহেব কৃত ‘তাফসীরে নূরুল এরফান’]

খোশ-খবরীর (মানে ঐশী সুসংবাদের) ব্যাপারে ওয়াকেফহাল থাকা সত্ত্বেও পুণ্যবান সাহাবা-এ-কেরাম (রা:) ‘সামূদ’ গোত্রের (করুণ) পরিণতি সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করেন এবং আল্লাহ-ভীতির (তাক্বওয়ার) কারণে তাঁর প্রতি সমর্পিত হন। এটা অনুশীলন করে তাঁরা বাস্তবায়ন করেন প্রিয়নবী (দ:)-এর শিক্ষাসমূহ এবং পূরণ করেন দ্বীন-ইসলামের একটি প্রয়োজনীয় শর্ত, যথা – (ঐশীদানের) আনন্দঘন মুহূর্তে খুশি ও দুঃখ-বেদনার সময় শোক প্রকাশ। অন্তর ও মস্তিষ্কে মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রত্যেকের উচিত ঘটনা হতে প্রত্যাশিত আবেগগুলোর রোমন্থন করা। কারো অন্তরে এ ধরনের আবেগ ও অনুভূতি গড়ে তোলার জন্যে একটি জায়গা বানিয়ে রাখা হয়েছে।

এখানে উল্লেখ্য যে, কোনো কিছু স্বাভাবিকভাবে অনুভব করা আর কোনো কিছুর জন্যে অনুভূতি সৃষ্টি করার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য বিরাজমান। কোনো ব্যক্তির যখন বিশ্বাস অটল-অবিচল এবং তার চেনাজানার সম্পর্ক-ও সুদৃঢ়, তখন তার আবেগ বৃদ্ধি পায় প্রেরণার ভিত্তিতে। কেউ এটা অর্জন করতে পারেন শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর প্রতি নিজের গোলামির প্রকৃত মর্ম উপলব্ধির মাধ্যমেই। কোনো দুঃখ-বেদনার ঘটনায় শোকের কারণে কারো অশ্রু প্রয়াসহীনভাবে গড়িয়ে পড়ে; আর খুশির ঘটনার মুহূর্তে উৎফুল্লচিত্তের কারণে কেউ স্বাভাবিকভাবেই স্মিতহাস্য করেন। এ উপায়ে অতীত ঘটনাবলীর স্মৃতিচারণ করাটা মহানবী (দ:)-এর উদ্দেশ্যের সাথে একদম সঙ্গতিপূর্ণ, আর এ বিষয়টি হাদীসগুলো হতে সপ্রমাণিত।

সবশেষে যে বিষয়টি উল্লেখযোগ্য তা হলো, পরম দয়াবান মহানবী (দ:) শুধু তাঁর মহান সাহাবা (রা:)-বৃন্দকে কান্নারত অবস্থায় উপত্যকাটি অতিক্রম করতে বলেই ক্ষান্ত হননি, বরঞ্চ তিনি নিজেও তা অতিক্রমের সময় কাপড় দ্বারা আপন শির মোবারককে আবৃত করেছিলেন এবং তাঁর সওয়ারকৃত উট দ্রুতবেগে ছুটিয়েছিলেন। এটা (দেখে) কারো কাছে এমন মনে হতে পারতো যে রাসূলুল্লাহ (দ:) ধ্বংসের মুখোমুখি (সামূদের) এসব লোকজন হতে বহু দূরে সরে যেতে চাইছিলেন।

প্রিয়নবী (দ:) এ রকম (আচরণ) করার কী প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন, যদিও বাস্তবতা ছিল এ ঘটনা বহু হাজার বছর আগে ঘটেছিল? আল্লাহর দৃষ্টিতে সর্বোচ্চ মর্যাদাবান পয়গম্বর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের মাক্বাম এমন-ই যে তিনি যেখানে যেতেন, সেখানেই রহমত (আশীর্বাদ) নাযেল হতো, আর শাস্তি নিবারণ হতো। মহানবী (দ:) স্বয়ং হচ্ছেন (খোদায়ী) করুণার পরমোৎকর্ষের মূর্ত রূপ এবং মানবজাতির সুপারিশকারী ত্রাতা। যাঁর খাতিরে আল্লাহতা’লা নিজের আরোপিত শাস্তি ফিরিয়ে নেন, তিনি কীভাবে ওই শাস্তির ভয়ে মুহ্যমান থাকবেন? এ ধরনের চিন্তা করাটাও অসম্ভব, এমন কি সবচেয়ে দুর্বল ঈমানদার ব্যক্তিও এভাবে চিন্তা করবেন না। অতএব, হুযূর পূর নূর (দ:) যদি ওই হালত তথা (মানসিক) অবস্থায় উপত্যকাটি ছেড়ে যান, তাহলে স্রেফ উম্মতকে শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যেই তিনি তা করেছিলেন।

২.৫ হস্তীবাহিনীর লোকদের প্রতি অবতীর্ণ শাস্তির স্মরণ এবং মুহাসসির উপত্যকা দ্রুত অতিক্রম

মুহাসসির উপত্যকা কোথায় অবস্থিত, এ ব্যাপারে মতপার্থক্য রয়েছে। একটি মত হলো, স্থানটি মুযদালিফা’র কাছে [এয়া’ক্বূত আল-হামাভী কৃত ‘মু’জাম আল-বুলদা’ন’, ১:৪৪৯]। ফযল ইবনে আব্বা’স (রহ:)-এর ভাষ্য মোতাবেক আরেকটি মত হলো তা মিনা’য় অবস্থিত [মুসলিম রচিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-হাজ্জ্ব’, ‘হাজ্বীর পাঠকৃত তালবিয়্যার সময়কাল’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৯৩১ #১২৮২; আল-নাসা’ঈ প্রণীত ‘আল-সুনান: কিতা’ব আল-মানা’সিক আল-হাজ্জ্ব’, ‘আরাফা হতে সফরের সময় শান্ত থাকার নির্দেশ’ শীর্ষক অধ্যায়, ৫:২৮৫ #৩০২০; আল-নাসা’ঈ লিখিত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ২:৪৩৪ #৪০৫৬; আহমদ ইবনে হাম্বল কৃত ‘আল-মুসনাদ’, ১:২১০ #১৭৯৬; এবং আল-বায়হাক্বী রচিত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:১২৭ #৯৩১৬]। শায়খ আবদুল হক্ব মোহাদ্দিসে দেহেলভী (রহ:) এই দুটো মতের মধ্যে সমন্বয় করে বলেন যে মুহাসসির উপত্যকা প্রকৃতপক্ষে মিনা’মুযদালিফা’র মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত [শায়খ আবদুল হক্ব দেহেলভী প্রণীত ‘আশয়াত আল-লুম’আ’ত শরহে মিশকা’ত আল-মাসা’বিহ’, ২:৩৪৫] মুযদালিফা’র আশপাশ এলাকাটিতে হাজ্বী সাহেবান অবস্থান করলেও মুহাসসির উপত্যকাটি ওই এলাকার বাইরে হওয়ায় সেখানে অবস্থান করতে তাঁদেরকে নিষেধ করা হয়েছে [আহমদ ইবনে হাম্বল কৃত ‘আল-মুসনাদ’, ৪:৮২ #১৬,৭৯৭; ইবনে হিব্বা’ন রচিত ‘আল-সহীহ’, ৯:১৬৬ #৩৮৫৪; আল-শায়বা’নী প্রণীত ‘’কিতা’ব আল-মাবসূত’, ২:৪২২; ইবনে আবী শায়বা লিখিত ‘আল-মুসান্নাফ’, ৩:২৪৬ #১৩৮৮৪-১৩৮৮৫; আল-দায়লামী রচিত ‘আল-ফেরদৌস বি-মা’সূর আল-খিতা’ব’, ৩:৪৪ #৪১১৩; আল-বায়হাক্বী কৃত ’আল-সুনান আল-কুবরা’, ৯:২৯৫ #১৯,০২১; আল-তাবারা’নী প্রণীত ‘আল-মু’জাম আল-কবীর’, ২:১৩৮ #১৫৮৩; আল-হায়সামী লিখিত ‘মজমা’ আল-যাওয়া’ঈদ ওয়া মানবা’ আল-ফাওয়া’ঈদ’, ৩:২৫১; এবং আল-হায়সামী কৃত ‘মজমা’ আল-যাওয়া’ঈদ ওয়া মানবা’ আল-ফাওয়া’ঈদ’, ৪:২৫]

যিলহজ্জ্ব মাসের ১০ তারিখ সূর্যোদয়ের প্রাক মুহূর্তে (ফজরের দুই রাক’আত নামায পড়ার সময়ে) হাজ্বী সাহেবান তালবিয়্যাপাঠ করতে করতে মিনা’র উদ্দেশ্যে মুযদালিফা ত্যাগ করেন; আর যখন তাঁরা মুহাসসির উপত্যকায় পৌঁছেন, তখন তাঁদেরকে আল্লাহর শাস্তি হতে বাঁচতে তাঁরই কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতে করতে দ্রুতবেগে সে স্থান অতিক্রম করতে হয়। [ওয়াহবা আল-যুহায়লী রচিত ‘আল-ফিকহু আল-ইসলা’মী ওয়া আদিল্লাতুহু’, ৩:২১৬৮]

কেন এটা এরকম? এ কারণে যে, প্রিয়নবী (দ:)-এর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমনের আগে বাদশাহ আবরাহা এক হস্তীবাহিনীসহ কা’বা শরীফ ধ্বংস করার ইচ্ছা করেছিল। তার অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে সে মুহাসসির উপত্যকায় পৌঁছুলে সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার গযব (রোষ) তার ওপর অবতীর্ণ হয়। এক ঝাঁক (আবাবীল) পাখি ওপর থেকে কঙ্কর নিক্ষেপ করে তাকে এবং তার হস্তীবাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করে দেয় [ইবনে হিশা’ম প্রণীত ‘অাল-সীরা আল-নাবাউইয়্যা’, পৃষ্ঠা ৬৫-৬৭; ইবনে আসীর কৃত ‘আল-কা’মিল ফী আল-তা’রীখ’, ১:৪৪২-৪৪৭; আল-সুহায়লী রচিত ‘আল-রওদ আল-উনুফ ফী তাফসীর আল-সীরা আল-নাবাউইয়্যা লি-ইবনে হিশা’ম’, ১:১১৭-১২৬; ইবনে আল-ওয়ার্দী লিখিত ‘তাতিম্মা আল-মুখতাসার ফী আখবা’র আল-বাশর’, ১:৯২; ইবনে কাসীর প্রণীত ‘আল-বেদা’য়া ওয়া আল-নেহা’য়া’, ২:১০১-১১০; আল-কসতলা’নী কৃত ‘আল-মাওয়া’হিব আল-লাদুন্নিয়্যা’, ১:৯৯-১০৪; আল-সা’লেহী রচিত ‘সুবুল আল-হুদা’ ওয়া আল-রাশা’দ ফী সীরা খায়র আল-এবা’দ’, ১:২১৭-২২২; এবং আল-যুরক্বা’নী লিখিত ‘শরহু আল-মাওয়া’হিব আল-লাদুন্নিয়্যা’, ১:১৫৬-১৬৬]। এই ঘটনাটি কুরআনে করীমের সূরা ফীল, অর্থাৎ, হস্তী অধ্যায়ে লিপিবদ্ধ আছে এভাবে:

হে মাহবূব! আপনি কি দেখেননি আপনার রব্ব ওই হস্তী আরোহী বাহিনীর কী অবস্থা করেছেন? তাদের চক্রান্তগুলোকে কি তিনি ধ্বংসের মুখে ছুঁড়ে ফেলেননি? এবং তাদের ওপর পাখির ঝাঁকগুলোকে প্রেরণ করেছেন; যেগুলো তাদেরকে কঙ্কর-পাথর দিয়ে হনন করছিল। অতঃপর (তিনি) তাদেরকে চর্বিত ক্ষেতের পল্লবের মতো করেছেন। [আল-ক্বুরআ’ন, ১০৫:১-৫]

এ কারণেই হজ্জ্ব পালনকালে মহানবী (দ:) তাঁর পুণ্যবান সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-কে মুহাসসির উপত্যকাটি তাড়াতাড়ি পার হয়ে যেতে আদেশ করেন। তাঁদের আচরণ ছিল শঙ্কার, যেন এই বুঝি শাস্তি এসে পড়বে; যে শাস্তি প্রকৃতপক্ষে বহু বছর আগেই আবরাহা ও তার হস্তীবাহিনীর ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল। এতদসত্ত্বেও প্রিয়নবী (দ:) তাঁর পুতঃপবিত্র সাহাবাবৃন্দ (রা:)-কে তাঁদের নিজেদের মধ্যে আল্লাহভীতির এক অনুভূতি/হাল জাগিয়ে তুলতে বলেন। তিনি নিজেও একই কাজ করেন, আর উপত্যকাটি ত্বরিত অতিক্রম করেন।

মুহাসসির উপত্যকা পার হওয়ার সময় হুযূর পাক (দ:)-এর হাল/অবস্থা হযরত আলী (কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ) বর্ণনা করেন এভাবে: তিনি মুহাসসির উপত্যকা পর্যন্ত গমন করলে তাঁর উটের লাগাম আপন পবিত্র হাতে নেন, আর উটটি দ্রুত উপত্যকা পার হয়ে যায়। অতঃপর তিনি থামেন। [আল-তিরমিযী প্রণীত ‘আল-জামে’ আল-সহীহ: কিতা’ব আল-হাজ্জ্ব’, ‘গোটা আরাফা দাঁড়াবার জায়গা মর্মে যাবতীয় বর্ণনা’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:২৩২ #৮৮৫; আহমদ ইবনে হাম্বল কৃত ‘আল-মুসনাদ’, ১:৭৫ #৫৬২; ইবনে খুযাইমা রচিত ‘আল-সহীহ’, ৪:২৭২ #২৮৬১; আল-বাযযার লিখিত ‘আল-বাহর আল-যুখা’র’, ২:১৬৫ #৫৩২; এবং আবূ এয়া’লা’ প্রণীত ‘আল-মুসনাদ’, ১:২৬৪ #৩১২]

শায়খ আবদুল হক্ক মোহাদ্দেসে দেহেলভী (৯৫৮-১০৫২ হিজরী) লেখেন: পদব্রজে হোক, বা সওয়ারে চড়ে হোক, এই উপত্যকাটি দ্রুত পার হওয়া মুস্তাহাব (প্রশংসনীয় আমল)। [আবদুল হক্ক দেহেলভী রচিত ‘আশ’আত আল-লোম’আত শরহে মিশকা’ত আল-মাসা’বীহ’, ২:৩২৪]    

মহানবী (দ:) কেন তাঁর সাহাবাবৃন্দকে (রা:) উপত্যকাটি দ্রুতবেগে অতিক্রম করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন? এখন তো আর (আবাবীল) পাখির ঝাঁক বা কঙ্করবৃষ্টির অস্তিত্ব-ই নেই। এর উত্তর হচ্ছে এটা এমনই এক আমল (অনুশীলন), যা থেকে আমরা উপদেশ ও সতর্কবাণী এবং নিজেদের আধ্যাত্মিক অবস্থার উন্নতিসাধন সংক্রান্ত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। উপত্যকাটিতে তাড়াতাড়ি পার হওয়ার এই ব্যাপারটি শেষ বিচার দিবস পর্যন্ত অনুশীলনীয় একটি সুন্নাহ’তে পরিণত হয়েছে, আর হাজ্বীদেরকে এই স্থানটি ত্বরিত অতিক্রমের হুকুম দেয়া হয়েছে।

এর পেছনে একটি উদ্দেশ্যই নিহিত আর তা হলো, অতীত ঘটনাবলী প্রত্যেকের অন্তরে স্মরণীয় হয়ে থাকা এবং মস্তিষ্কে সেগুলোকে দৃঢ়ভাবে গেঁথে রাখা। ওপরোক্ত হাদীসগুলো এর সত্যতা প্রতিপাদন করে; এধরনের ঐতিহাসিক ঘটনা দ্বীন-ইসলামের শিক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।  

২.৬ হযরত উমর ফারূক (রা:) কর্তৃক ব্যক্ত অনুতাপ

কারো দ্বারা স্মৃতিরোমন্থনে আনন্দ-বেদনার আবেগ-অনুভূতি লাভ করা একেবারেই স্বাভাবিক; তাদের চেহারাতেই ওই অভিব্যক্তি দৃশ্যমান হয়। কোনো আনন্দঘন মুহূর্ত দেখা দিলে মানুষের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে; কিন্তু দুঃখবেদনায় চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরে। এই সূত্রে হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা:)-এর একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে: হযরত আবদুর রাহমান বিন আবী লায়লা (রা:) বর্ণনা করেন, হযরত উমর (রা:) ফজরের নামাযে আমাদের ইমাম হন। তিনি সূরা ইউসুফ তেলাওয়াত করছিলেন যখন নিম্নের আয়াতে পৌঁছেন – “আর তাঁর নয়নযুগল শোক-সন্তাপে শ্বেতবর্ণ ধারণ করেছিল, কিন্তু তিনি তাঁর দুঃখ চেপে রেখেছিলেন।” এ সময় হযরত উমর (রা:) কাঁদতে থাকেন অঝোর ধারায়। এরপর তিনি রুকু (দাঁড়িয়ে নত) অবস্থায় গমন করেন। [আল-শায়বানী লিখিত ‘কিতা’ব আল-হুজ্জা ‘আলা’ আহল আল-মাদীনা’, ১:১১৩ ও ১১৫-১১৬; এবং আল-তাহা’বী প্রণীত ‘শারহ মা’আনী আল-আসা’র’: কিতা’ব আল-সালা’ত’, ‘ফজর ওয়াক্তের সময়’ শীর্ষক অধ্যায়, ১:২৩৩ #১০৫১]

ইবনে আবযী বলেন, আমি হযরত উমর (রা:)-এর ইমামতিতে নামায পড়ছিলাম। তিনি সূরা ইউসুফ তেলাওয়াত করছিলেন যখন নিম্নের আয়াতে উপনীত হন – “আর তাঁর নয়নযুগল শোক-সন্তাপে শ্বেতবর্ণ ধারণ করেছিল, কিন্তু তিনি তাঁর দুঃখ চেপে রেখেছিলেন।” এমতাবস্থায় হযরত উমর (রা:) কান্নায় আপ্লুত হয়ে পড়েন; অতঃপর তিনি রুকূতে যান। [ইবনে ক্বুদা’মা রচিত ‘আল-মুগ্বনী’, ১:৩৩৫]

এই হাদীসগুলোতে আমরা দেখতে পাই যে হযরত উমর (রা:) পয়গম্বর এয়াক্বূব (আ:)-এর কষ্টে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর আহাদীসে এবং ক্বুরআন মজীদের তাফসীরগুলোতে এমন অসংখ্য নজির আছে, যা প্রমাণ করে যে ঈমানদারীর নির্যাস মানুষের অন্তরের অন্তস্তলে নিহিত – এই হালত বা আত্মিক/আধ্যাত্মিক অবস্থার ধারণ প্রত্যেক ঈমানদারকে এর মিষ্টস্বাদের আশীর্বাদ এনে দেয়। এমন কি মহানবী (দ:)-এর প্রতি ঈমান আনাও মূলতঃ কোনো ঈমানদারের অন্তরসংশ্লিষ্ট বৈশিষ্ট্য; হুযূর পাক (দ:)-এর আনুগত্য ও অনুসরণ-ও তাঁরই প্রতি ঈমানদারের অন্তরের মহব্বত হতে সৃষ্ট। তাঁর আশীর্বাদধন্য বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন)-কে আল-ক্বুরআনে মানবজাতির জন্যে আল্লাহতা’লার সর্বশ্রেষ্ঠ রহমত (করুণা) হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে [আল-ক্বুরআন, ৩:১৬৪]। এই রহমতের প্রতি কীভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা যায়? রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর এই শুভাগমনকে তার প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা কীভাবে দেয়া যায়? প্রিয়নবী (দ:)-এর জন্যে ঈমানদারের পরম এশক্ব-মহব্বত কীভাবে প্রকাশ করা যেতে পারে? এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদেরকে একটি (সিদ্ধান্তের) দিকেই নিয়ে যায়, আর তা হচ্ছে মওলিদুন্নবী (দ:) উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করা। এই শুভক্ষণে আমরা সভা-সমাবেশের আয়োজন করি এবং হুযূর পূর নূর (দ:)-এর ভালোবাসায় আবেগাপ্লুত হই; আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ-ই তাঁর আনুগত্যে আমরা নিয়ে থাকি।

এই আলোচনার সারমর্ম হলো, অতীত ঘটনাবলীর প্রতি আনন্দ বা দুঃখ প্রকাশ এবং নিজের মধ্যে ওই অবস্থা সৃষ্টি করা রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর সুন্নাহ’রই আওতায় পড়ে। যদিও মহানবী (দ:)-এর বেলাদত শরীফের পরে চৌদ্দশ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, তবুও ধরাধামে তাঁর আশীর্বাদধন্য শুভাগমনকে স্মরণ করে আমরা আমাদের খুশি প্রকাশ করে থাকি। মওলিদুন্নবী (দ) পালনের ক্ষেত্রে যে কারণে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করি তা হলো, নবী করীম (দ:) স্বয়ং অতীতে সংঘটিত ঘটনাবলীর ব্যাপারে তাঁর সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-কে সেগুলো স্মরণ করতে আদেশ দিয়েছিলেন এবং ওইসব ঘটনার অভিজ্ঞতা নিজেদের (অন্তরের) মধ্যে পুনরায় জীবন্ত করে তুলতে বলেছিলেন। তাই এটা মহানবী (দ:) ও তাঁর সাহাবা-এ-কেরাম (দ:)-এর সুন্নাহ বটে।

এই ধূলির ধরায় মহানবী (দ:)-এর শুভাগমন আল্লাহতা’লার সর্বসেরা রহমত তথা করুণা; এ এক মহা অনুগ্রহ ও ঐশীদান। এই উম্মতের জন্যে এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লগ্ন। মা আমেনা (রা:) যে আনন্দ ও আবেগের কম্পনভাব অনুভব করেছিলেন, প্রত্যেক মুসলমান-ব্যক্তিকেও অনুরূপ খুশি ও উৎফুল্লচিত্ত হওয়া চাই। মহাসম্মানিত পয়গম্বর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের উম্মত হিসেবে মওলিদুন্নবী (দ:)-এর উদযাপনের মাধ্যমে এই চৌদ্দশ বছরের (ঐতিহ্যবাহী) ঘটনার স্মৃতি অন্তরে জাগুরূক রাখা আমাদের জন্যে তাই অবশ্যকর্তব্য হয়েছে।

পোষ্টটি ভালো লেগে থাকলে আপনার মূল্যবান মতামত জানান প্লিজ!
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •