মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, কাসেম সোলাইমানীর মৃত্যু ও কিছু প্রশ্নের উত্তর – আবুল হুসাইন আলেগাজী

পোষ্টটি অন্যকে পড়ার সুযোগ করে দিতে শেয়ার করুন প্লিজ।

আমি দেড়যুগ ধরে (২০০২ থেকে) ইন্টারনেটে আরব দুনিয়ার পত্র-পত্রিকা পড়ে আসছি। শুরুর দিকে সাইবের ক্যাফে, পরে নিজস্ব কম্পিউটারে মডেমের মাধ্যমে ও কয়েকবছর ধরে মোবাইল ফোন ডিভাইসেই পড়ছি। তাই আরব দুনিয়ার ধর্ম, রাজনীতি ও ভূগোল সম্পর্কে ইতিমধ্যে আমার যথেষ্ট জ্ঞান অর্জিত হয়েছে।

মৃত্যুর পর যারা কাসেম সোলাইমানীর নাম শুনেছেন, তারাই তাকে নিয়ে বেশী মাতামাতি করছেন বলে মনে হয়। অবশ্য দেশ-দুনিয়ার খবর রাখা ভালো। তবে নিজের ঈমান-আমলের খবর ঠিক রেখে। তবে সত্য হলো, যেসব লোক আসল কাজে (আল্লাহর হক ও বান্দার হক আদায়ে) পশ্চাদপদ, তারাই দেশ-দুনিয়ার বিভিন্ন ঘটনা-অঘটন নিয়ে পর্যাপ্ত না জেনে ও যথেষ্ট না বুঝে অধিক মাতামাতির অহেতুক কাজ করে।

ইরানের জেনারেল কাসেম সোলাইমানীর খ্যাতি এবং অতঃপর জায়ো-মার্কিন চক্রের হাতে তার মারা যাওয়ার কারণ হলো, তিনি ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সরকারের প্রভাব বিস্তারের প্রধান কারিগর।
সত্য হলো, বর্তমান দুনিয়ার কোথাও আহলুস সুন্নাহ বা সুন্নীদের প্রতিনিধিত্বকারী কোনো ইসলামী রাষ্ট্র না থাকলেও শিয়াদের তা রয়েছে। আর তাহলো মোল্লা (হুজুর) শাসিত ইরান। তার মানে দুনিয়াতে শিয়া ইসলামিস্টদের অভিভাবক (ইরান) থাকলেও সুন্নী ইসলামিস্টদের কোনো অভিভাবক নেই। তবে একসময় (১৯৯৬-২০০১) মোল্লা উমর শাসিত আফগানিস্তান ছিল।

কাসেম সোলাইমানীর জীবনের উল্লেখযোগ্য দিক, তার হত্যার কারণ ও সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে কথা বলার আগে ইরান ও শিয়া মতবাদ নিয়ে কিছু বিষয় ক্লিয়ার করা দরকার।
আরবী শিয়া শব্দের অর্থ দল। কোরআন মজীদে আছে, وَإِنَّ مِنْ شِيعَتِهِ لإٍبْرَاهِيمَ “তাঁর (নূহের) শিয়া/দলভুক্ত আরেকজন হলেন ইব্রাহীম।”[সূরা সফফাতঃ ৮৩]। আরবী আছহাব শব্দটি শিয়ার প্রতিশব্দ হিসেবে আসে।
৩৫ হিজরীতে খারেজীমনা বিদ্রোহীদের হাতে তৃতীয় খলীফা হযরত উসমানের শাহাদতের পর হযরত আলী সর্বসম্মতিক্রমে চতুর্থ খলীফা নির্বাচিত হন। এতে মদীনায় অবস্থানরত হযরত উসমানের পরিবারও বাইয়াত (আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি) দেন। কিন্তু শামের গভর্ণর মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান দেননি।
নবীজি সঃ এর হাশেমী গৃহের সাথে মক্কার উমাইয়ার গৃহের একটি দ্বন্দ্ব মক্কাতে ইসলামের শুরু থেকেই ছিল। সত্যবাদী ছাহাবী হযরত উসমানসহ হাতেগোনা কয়েকজন উমাইয়া সন্তান ইসলাম গ্রহণ করলেও তাদের অধিকাংশই ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। আর বদর যুদ্ধে মক্কার শীর্ষ নেতাদের অধিকাংশের জাহান্নাম যাত্রা শুরু হওয়ার পর কুফফারে মক্কার হাল ধরে খ্যাতিমান উমাইয়া সন্তান আবু সুফিয়ান।

অষ্টম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের সময় আবু সুফিয়ান ও তার সন্তানেরা নিজেদের জীবনের সার্বিক দিক বিবেচনা ইসলাম গ্রহণ করলেও তাদের চিন্তায় জাহেলী সামাজিক আভিজাত্যবোধ থেকেই যায়। মক্কা বিজয়ের দিন নবীজি সঃ তাদের প্রতি জেনারেল অ্যামিনিস্টি বা সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেও তাদেরকে খুব একটা কাছে টানেননি। তিনি কাছে রাখতেন আবু জেহেল ও আবু সুফিয়ানদের হাতে নিগৃহীত হওয়া মক্কার মুহাজির ছাহাবীদের।

যাই হোক, হযরত আলী খলীফা হওয়ার পর হযরত উমরের আমলে বাইচান্স দামেস্কের গর্ভণর হওয়া মুয়াবিয়া (বিন আবু সুফিয়ান ও আবু এজিদ) তাকে (খলীফা আলীকে) এই বলে বাইয়াত দিতে অস্বীকার করলেন যে, আগে আপনি উসমানের খুনীদের বিচার করুন। অথচ এমন দাবি ছিল সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টা। কারণ, হযরত উসমান নিজে তের বছরের ক্ষমতাসীন খলীফা হয়েও যেখানে বিদ্রোহীদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি, সেখানে বিশৃঙ্খল অবস্থায় উম্মতের নেতৃত্বের হাল ধরতে যাওয়া হযরত আলীর পক্ষে উসমান হত্যার দ্রুত বিচার করা শুধু অসম্ভবই নয়; কল্পনাতীতও ছিল। কিন্তু জীবিত অবস্থায় হযরত উসমানকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়া তাঁর দূর সম্পর্কীয় চাচাতো ভাই মুয়াবিয়া তাঁর নিহত হওয়ার পর নতুন খলীফা হযরত আলীকে বাইয়াত না দিয়ে উম্মতের মাঝে বিশৃঙ্খলা আরো উসকে দেন। অথচ হযরত উসমানের স্ত্রী ও সন্তানেরা ওই হত্যকান্ডের বিচারের দাবিতে হযরত আলীর প্রতি এমন বিদ্রোহ করেননি। তাছাড়া ইসলামে নিকটাত্মীয় উপস্থিত থাকা অবস্থায় দূরের আত্মীরা মৃতদের কোনো কিছুর মালিক হয় না। কিন্তু মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান যেহেতু ক্ষমতালোভী ছিলেন, তাই তার কাছে এসবের গুরুত্ব ছিল না।

মূলত মুয়াবিয়ার পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে চাওয়ার কারণ এই ছিল যে, হযরত আলী খলীফা হওয়ার পর মুয়াবিয়াকে অব্যাহতি দিয়ে অন্য একজনকে শামের গভর্ণর হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন। যাই হোক, ওই সময় পরিস্থিতি ঘোলাটে হলে সাধারণ মুসলমানদের অনেকে ভেবে নেয় যে, হযরত আলী উসমান বিরোধী শক্তির প্রতিনিধিত্বকারী। আর মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান উসমান পক্ষের প্রতিনিধিত্বকারী। তো তখন থেকে হযরত আলীর অনুসারীদের শিয়াতু আলী ও মুয়াবিয়ার অনুসারীদের শিয়াতু উসমান বলা শুরু হয়। তবে উভয়পক্ষের মাঝে মধ্যস্থতা করার জন্য চেষ্টাকারী হযরত তলহা, জুবাইর ও আয়েশাকে নিরপেক্ষ বলা যায়। কিন্তু নিরপেক্ষ হয়ে তাদের মধ্যস্থতা করতে যাওয়াটাই ছিল সম্পূর্ণ ভুল। উলামায়ে আহলে সুন্নতের মতে, তাদের উচিত ছিল, বিদ্রোহী মুয়াবিয়াকে বাইয়াত দিতে বাধ্য করা এবং অতঃপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে উসমান হত্যার বিচার চাওয়া।

শিয়াতু আলীর মাঝে শীর্ষ মুহাজির ও আনছার ছাহাবীদের অনেকে থাকলেও বিদ্রোহী মুয়াবিয়ার পক্ষে একজন মুহাজির ও আনছার ছাহাবীও ছিলেন না। তবে তাদের সন্তানদের কেউ কেউ ছিল। হযরত আলীর জীবদ্দশায় এমনকি পরবর্তী আরো শত বছর পর্যন্ত তার অনুসারীরা বিদ্রোহী মুয়াবিয়ার প্রতি বিরূপ ধারণা পোষণ করলেও তার পূর্ববর্তী খলীফাদের প্রতি কেউ বিরূপ ধারণা পোষণ করতেন না। কিন্তু আব্বাসী খেলাফতের সময় ‘আলী মুমিনদের মাওলা’ শীর্ষক হাদীসের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে একদল জাহিল ও বকধার্মিক শিয়া দাবি করে যে, হযরত আলীই ছিলেন খেলাফতের প্রথম অধিকারী। হযরত আবু বকর, উমর ও উসমানের নাকি খলীফা হওয়ার কোনো অধিকার ছিল না। তারা নাকি জোর ও কৌশল খাটিয়ে হযরত আলী থেকে তা ছিনিয়ে নিয়েছেন। অথচ এমন দাবি হযরত আলী নিজে ও আহলে বাইতের কেউই করেননি। মূলত শিয়াদের মাঝে বিভ্রান্তি শুরু হয় ‘আলী মুমিনদের মাওলা’ হাদীসের এমন ভুল ব্যাখ্যা থেকেই। শিয়াদের বাড়াবাড়ির জবাবে নির্ভরযোগ্য উলামায়ে আহলে সুন্নতের মতামত হলো, শিয়ারা মুসলিম তথা উম্মতে মুসলিমার অন্তর্ভূক্ত হলেও তাদের মধ্যকার যে কেউ হযরত আবু বকর ও হযরত উমরকে কাফির/মুনাফিক আখ্যা দিবে, সে নিজেই কাফির/মুনাফিক হবে। তবে যারা হযরত আলীকে খেলাফতের জন্য হযরত আবু বকর ও হযরত উমরের চেয়ে অধিক হকদার মনে করবে, তাদেরকে তাকফীর করা যাবে না। অনুরুপ যেসব শিয়া মুয়াবিয়া ও এজিদকে মুনাফিক বলবে, তাদেরকেও তাকফীর করা যাবে না। কিন্তু প্রতি যুগে কুকুর-শিয়াল মার্কা কিছু সুন্নী আলেম নিজের দল ও নিজের অনুসারী ছাড়া বাকী সকল মুসলমানদের নানা অজুহাতে কাফির-মুনাফিক বলতে অভ্যস্ত হয়। আর কিছু গাধামার্কা মুসলমান তা নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করে। এই দুই শ্রেণীর লোকদের শব্দ দূষণে মুসলিম কমিউনিটিগুলো বর্তমানে অনেকটা দূষিত।

হাদীসে বর্ণিত খোরাসান অঞ্চলটি ইসলামের জন্য বরাবরই উর্বর ভূমি। বর্তমানে এই খোরাসানের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে উন্নত মুসলিম দেশ হলো ইরান। ইসলামের দেড় হাজারের বছরের ইতিহাসের প্রথম এক হাজার বছর পর্যন্ত এটি ছিল সুন্নীদের দ্বারা শাসিত। ওখানে জোরপূর্বক শিয়া শাসন ও শিয়ামত চেপে বসেছে আজ থেকে মাত্র পাঁচশত বছর পূর্বে ইসমাঈল সাফাভী নামের এক যুবকের নেতৃত্বে।
ইমাম মুসলিম, ইমাম ইবনে মাজা, ইমাম বাইহাকী, ইমাম হাকেম, ইমাম আবু নুয়াইম, ইমাম জুওয়াইনী, ইমাম ওয়াহিদী, উমর খৈয়াম, শেখ সাদী, ফরিদুদ্দীন আত্তার সহ আলোচিত শীর্ষ সুন্নী জ্ঞানী-গুণীদের অনেকেরই জন্ম এই ইরানেই। বাকীদের জন্ম পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে। তন্মধ্যে ইমাম বোখারী ও ইমাম তিরমিযীর জন্ম উজবেকিস্তানে। ইমাম নাসায়ীর জন্ম তুর্কমেনিস্তানে। ইমাম আবু দাউদের সাজিস্তানে (বর্তমানে অঞ্চলটি বিলুপ্ত এবং এটি এখন আফগানিস্তান, ইরান ও পাকিস্তানে ব্যপ্ত হয়ে আছে)

আজ থেকে প্রায় পাঁচশত বছর পূর্বে ইসমাঈল সাফাভী ইরানের লোকদের উপর জোর পূর্বক শিয়া মতবাদ চাপিয়ে দিলেও ইরানবাসী উগ্রবাদে দীক্ষিত হয়নি। আফগানিস্তানসহ খোরাসানের অন্যান্য এলাকার ন্যায় তারাও ধর্মীয় ব্যাপার মধ্যপন্থী।
আজকের দুনিয়াতে ইরান ও আফগানিস্তানই হলো একমাত্র মোল্লা শাসিত দেশ। ইরান সরকারে সর্বোচ্চ ক্ষমতাসীন ব্যক্তি হলেন অভিভাবক পরিষদের চেয়ারম্যান। এই পরিষদই ইরানের নীতি নির্ধারণ করেন। এই পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন বিপ্লবের নায়ক রুহুল্লাহ খোমেনী। বর্তমানে এটির চেয়ারম্যান হলেন আলী খামেনী। ইরান তেল সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি ওখানে রুহুল্লাহ খোমেনী নামের এমন এক পপুলার ও পাওয়ারফুল মোল্লা নেতার জন্ম হয়েছে, যিনি আমেরিকা সমর্থিত সেক্যুলার রেজাশাহ পাহলেভীর বিরুদ্ধে সফল গণ-অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সেখানে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর আফগানিস্তানে মোল্লা উমরের (মোল্লা উমর তালেবানের ইসলামিক আমিরাতের আমীরুল মুমিনীন তথা সর্বোচ্চ ক্ষমতাসীন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি থাকতেন কান্দাহারের একটি জীর্ণ কুটিরে। আর তালেবান সরকারের প্রেসিডেন্ট ছিলেন মোল্লা হাসান রব্বানী, যিনি থাকতেন রাজধানী কাবুলে) মত পাওয়ারফুল ইসলামী নেতৃত্বের সৃষ্টি হলেও দুইটি কারণে আজও সেখানে ইরানের মত শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এক. আফগানিস্তান সুন্নী প্রধান দেশ। আর পশ্চিমা ইসলাম বিরোধী শক্তি শিয়া ইসলামের চেয়ে সুন্নী ইসলামকেই অধিক ভয় পায়। কারণ, সুন্নী ইসলাম শিয়া ইসলামের চেয়ে অধিক খাঁটি এবং বিশ্ব মুসলিমদের ৮০% সুন্নী ইসলামের অনুসারী। দুই. আফগানিস্তানের মাটির নীচে ইরানের মত তেলের দরিয়া নেই।

এবার আসুন ৩ জানুয়ারী বাগদাদে শীর্ষ ইরাকী সহযোগীসহ নিহত ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর আল-কুদস ব্রিগেডের প্রধান কাসেম সোলাইমানী প্রসঙ্গে।
আমি দেখতে পাচ্ছি, আলোচিত এই লোকটির জীবন ২০১১ সালে আমেরিকার হামলায় পাকিস্তানে নিহত ওসামা বিন লাদেনের মতই কর্মময়। উভয়ের (ওসামা বিন লাদেন ও কাসেম সোলাইমানী) জন্মও একই বছর (১৯৫৭ সালে)।
ওসামা বিন লাদেনের সংগ্রামী জীবন শুরু হয় আশির দশকে (১৯৮০-১৯৯০) সোভিয়েত ইউনিয়ন সমর্থিত আফগানিস্তানের কমিউনিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদের মধ্য দিয়ে। সোভিয়েত ইউনিয়ন বিরোধী ওই যুদ্ধে পূঁজিবাদী পশ্চিমা জগত আফগানদের সমর্থন করায় অনেকে ওই যুদ্ধকে আমেরিকার যুদ্ধ বলে থাকে। অথচ বাস্তবতা হলো, ওই যুদ্ধ শুরু করেছিল আফগান ইসলামপন্থী ও ধর্মপ্রাণ জনসাধারণ। পরে আমেরিকা নিজস্ব স্বার্থ থেকে তাতে সমর্থন দিয়েছিল। অন্যদিকে একই সময় (১৯৮০-১৯৮৮) ইরাকের বামপন্থী (বাথিস্ট) সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধেে লিপ্ত হয়েছিল খোমেনীর নেতৃত্বাধীন ইসলামী বিপ্লবোত্তর ইরানও। ওই যুদ্ধে সৌদি-মার্কিন জোট ইরাককে সমর্থন করলেও ইরানের বিরুদ্ধে বাথিস্ট ইরাক জিততে পারেনি।
আলোচিত কাসেম সোলাইমানীর যুদ্ধ জীবন শুরু হয়েছিল ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবোত্তর ইরানের আজারবাইজান সীমান্তে কুর্দী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমন অভিযানে অংশগ্রহণের দিয়ে। এরপর তিনি যোগ দেন ইরাক বিরোধী যুদ্ধে (১৯৮০-১৯৮৮)। ওই যুদ্ধে তিনি ইরাক সীমান্তবর্তী কারমান জেলায় সা‘রুল্লাহ (আল্লাহর প্রতিশোধ) ব্রিগেডের নেতৃত্ব দেন।
যুদ্ধকৌশলী কাসেম সোলাইমানীকে ১৯৯৮ সালে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর আল-কুদস ব্রিগেডের সাবেক প্রধান আহমদ ওয়াহিদীর স্থলাভিষিক্ত করা হয়। ২০০১ সালে আমেরিকার বুশের নেতৃত্বে আফগান তালেবান বিরোধী যুদ্ধে সোলাইমানীর বিরুদ্ধে আমেরিকাকে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কারণ, পিউর ইসলামপন্থী তালেবানরা সুন্নী রব্বানী, সুন্নী হেকমতিয়ার, কমিউনিস্ট দোস্তম ও শিয়া হিজবে ওয়াহদাত সকলকে হটিয়ে ক্ষমতায় বসেছিল। আমেরিকার সর্বাত্মক যুদ্ধের মুখে ২০০১ এর নভেম্বরে তালেবান সরকার রাজধানী কাবুল ছেড়ে আশপাশে অবস্থান নিয়ে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করার পর ২০০২ সালের জানুয়ারীতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াকার বুশ এক ভাষণে ইরাক, সিরিয়া ও নর্থকোরিয়ার সাথে ইরানকেও দুষ্ট চক্রের সদস্য বলে অভিযোগ আনেন। ফলে আমেরিকার সাথে ইরানে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার চিন্তা মাঠে মারা যায়। অবশ্য মোল্লা শাসিত ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার বিরোধ খোমেনীর রেজাশাহ বিরোধী অভ্যুত্থানের সময় থেকেই চলে আসছে।

কাসেম সোলেমানী আল-কুদস কোরের প্রধান হওয়ার পর লেবাননের হিজবুল্লাহসহ ইরান সমির্থত আরব মিলিশিয়াদের সাথে সম্পর্ক মজবুত করেন। তিনি ইয়েমেনে জাইদী সম্প্রদায়ভুক্ত হূথী বিদ্রোহীদের সহায়তা করেন। ফিলিস্তীনের সুন্নী প্রতিরোধ সংস্থা হামাসের সাথে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন। সাদ্দামেের পতন পরবর্তী ইরাকে আল-হাশদু শা‘বী নামক মিলিশিয়া গঠনে সহায়তা করেন। তিনদিন আগে (৩ জানুয়ারী) বাগদাদ আন্তর্জাতিক এয়াপোর্টের কাছে মার্কিন মিসাইল হামলায় নিহত হওয়ার সময় সোলাইমানীর সাথে আল-হাশদু শা‘বীর অন্তত পাঁচজন শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরাকের বিভিন্ন সূত্র।

সোলাইমানীর সবচেয়ে বড় আলোচিত ও সমালোচিত কাজ হলো সিরিয়ার বাথিস্ট আসাদ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা পালন করা। বলা হয়, বর্তমান চারটি আরব দেশে ইরান সমর্থিত শক্তি ক্ষমতাসীন এবং ইরানের এই সাফল্যের পিছনের কারগির হলেন কাসেম সোলাইমানী। ওই দেশগুলো হলো ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেন। অবশ্য সৌদি আরব হস্তক্ষেপ না করলে আট বছর আগেই শিয়া প্রতিবাদকারীদের হাতে বাহরাইনে সুন্নী রাজতন্ত্রের পতন ঘটতো বলে ধারণা করা হয়। ইরানের টার্গেট ছিল শিয়া প্রধান বাহরাইনে নিজেদের পছন্দের শক্তিকে ক্ষমতায় আনার পর শিয়া প্রধান সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে ইয়েমেনের হূথী বিদ্রোহীদের ন্যায় একটি মিলিশিয়া বাহিনী সৃষ্টি করে সেখানে ইরান সমর্থিত শিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। অবশ্য এটা জানতে পেরে সৌদি সরকার সেখানকার (সৌদি পূর্বাঞ্চলের) বিপ্লবী শিয়া আলেম শায়খ নিমর আল-নিমরকে ২০১৬ এর প্রথম দিবসে ৪০জন আলকায়েদা যোদ্ধার সাথে মেরে ফেলে (শিরচ্ছেদ করে)।

সিরিয়ার আসাদ সরকার (বাশার আল-আসাদের পিতার নাম হাফেজ আল-আসাদ) ও তার প্রতিবেশী ইরাকের সাদ্দাম সরকার উভয়ে বাথিস্ট তথা বাম জাতীয়তাবাদী ছিল। হাফেজ আল-আসাদ ও সাদ্দাম হোসেন উভয়ে আর্মি ক্যু’র মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিল। তবে ইসলামপন্থীদের ন্যায় বামপন্থীরাও সাধারণত মিলে থাকতে পারে না। তাই আসাদ ও সাদ্দাম সরকারের মাঝে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
মজার বিষয় হলো, সুন্নী প্রধান দামেস্কে ক্ষমতাসীন হাফেজ আল-আসাদের জন্ম হয়েছিল আলাভী (ধর্মচ্যুত দুনিয়ামুখী একটি প্রাচীন শিয়া উপদল) সম্প্রদায়ে। আর শিয়া প্রধান বাগদাদে ক্ষমতাসীন সাদ্দাম হোসাইনের জন্ম হয়েছিল সুন্নী সম্প্রদায়ে। উভয়ে বামপন্থী একনায়ক হলেও ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতো না। তবে ইখওয়ান তথা বিপ্লবী ইসলামপন্থীদেরকে উভয়ের কেউ সহ্য করেনি। উভয়ে তাদেরকে কঠোর হস্তে দমন করেছে। তবে বুদ্ধির দৌড়ে হাফেজ আল-আসাদ সাদ্দামের চেয়ে এগিয়ে ছিল। তার মাঝে হঠকারিতা কম ছিল। যে কারণে তিনি রাশিয়ার সাথে যেমন সম্পর্ক ভালো রাখেন, তেমনি খোমেনীর নেতৃত্বাধীন ইরানের সাথেও। তার ছেলে বাশারকে তিনি উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত (এমবিবিএস ডাক্তার) বানান। অন্যদিকে তিনি ধর্মীয় ক্ষেত্রে যোগ্য সুন্নী স্কলারদের পদায়ন করতেন। যেমন শায়খ সাঈদ আল-বূতী। তবে তার বড় সৌভাগ্য হলো, সিরিয়াবাসী এজীদের জনক সেই বাদশা মুয়াবিয়ার সময় থেকেই তাদের সরকারের প্রতি কঠোর ভাবে অনুগত। এটা শামের মানুষদের ঐতিহ্য বলা যায়। এর বিপরীতে ইরাকের মানুষ। তাদের মাঝে বিশ্বাসঘাকতকতার প্রবণতা রয়েছে। ইরাকের শিয়া ও সুন্নী উভয় গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই কথা প্রযোজ্য।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান রাজনীতিতে দুইটি পক্ষ রয়েছে। এক পক্ষে আছে তুরস্ক, ইরান ও কাতারের মত আলোচিত দেশ। আরেক পক্ষে আছে সৌদি আরব, আমিরাত ও ইসরাঈলের মত আলোচিত দেশ। আমেরিকার পলিসি হলো সবার মাঝে দ্বন্দ্ব জিইয়ে রেখে নিজের স্বার্থ (মোড়লগিরি, ব্যবসা ও অস্ত্র ব্যবসা) জিইয়ে রাখা। তবে আমেরিকার সমর্থনের পাল্লা দ্বিতীয় পক্ষের (সৌদি-আমিরাত ও ইসরাঈলের) প্রতি বেশি।
আমেরিকা সিরিয়া, ইরাক বা অন্য কোথাও নিজের স্বার্থ ছাড়া পা নাড়ে না। তবে ট্রাম্পের সোলাইমানী হত্যার অনুমোদন বিষয়ে যা শোনা যাচ্ছে, তাহলো সোলাইমানী ইরাক থেকে মার্কিনীদের তাড়িয়ে দেবার পরিকল্পনা করেছিলেন। সোলাইমানী চেয়েছিলেন ইরাকে ইরান সমর্থিত সরকারকে নিরাপদ করতে। তবে সোলাইমানী হত্যায় ব্যবহৃত মিসাইলের জন্য সৌদি-আমিরাত চক্র আমেরিকাকে কত কোটি ডলার বিল দিয়েছে, তা জানা না গেলেও বিল দেওয়ার বিষয়টি শতভাগ সত্য বলেই মনে হয়।
যাই হোক, সোলাইমানী হত্যার প্রতিক্রিয়ায় ইরান বলেছে, তারা এর প্রতিশোধ নিবে এবং এই প্রতিশোধ প্রকাশ্য যুদ্ধ আকারে হবে না। কারণ, ব্যক্তি সোলাইমানীর মৃত্যুতে ইরানের অস্তিত্ব সংকটে পড়েনি। তার শূণ্যস্থান পূরণ করার মত লোক তাদের অনেক আছে। ইরানের পলিসি হলো নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখে সামনে এগুনো।

এবার আসুন কিছু অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তরে। প্রশ্নগুলো হলোঃ
১. জনপ্রিয়তা কমার পরও মার্কিন তাঁবেদার সৌদি সরকার কেন এতদিন টিকে আছে?
২. এত রক্ত ঝরার পরও খুনী স্বৈরচার আসাদ সরকারের পতন হলো না কেন?
৩. শত চেষ্টা করেও জায়ো-মার্কিন চক্র সমর্থিত সৌদি-আমিরাত জোট কেন তুরস্ক, ইরান ও কাতার সরকারের পতন ঘটাতে পারছে না?

আমার অনুভবে এসব প্রশ্নের উত্তর হলোঃ
১. সৌদি সরকারের পতন হওয়ার মত সময় এখনো আসেনি। কারণ, তারা নিজস্ব শক্তির উপর ভিত্তি করে ভালো-মন্দ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তারা আওয়ামীলীগের ভারতের ডানায় ভর করে চলার মতই আমেরিকার ডানায় ভর দিয়ে চলে। আর আমেরিকার পলিসি হলো, বিরোধী পক্ষকে জিইয়ে রেখেই নিজের স্বার্থ উদ্ধার করা। তাই আমেরিকা সৌদি-আমিরাত চক্রকে কাতার দখলের অনুমতি দিচ্ছে না। আমেরিকা সৌদি আরবকে এমন কাজে সমর্থন দিলে হয়তো সৌদি সরকারের জনপ্রিয়তা শূণ্যতায় নেমে এসে তাদের পতন হতো।

২. আসাদ সরকারের পতন না হওয়ার কারণ হলো, তার বিরুদ্ধে যে ইস্যুতে বিদ্রোহ হয়েছে, সে ইস্যুটি সিরিয়ার বিদ্রোহীদের সমর্থনকারী সমর্থক রাষ্ট্রগুলোর অবস্থা বিবেচনায় সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। যেমন বলা হচ্ছে, আসাদ সরকার স্বৈরচার। তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। কিন্তু যেই সৌদি আরব আসাদ বিরোধীদের সমর্থন ও সাহায্য দিয়েছে, তারা কতটুকু গণতান্ত্রিক? তারাও কি বিরোধীদের কঠোর হস্তে দমন করে না? দ্বিতীয়ত বলা হচ্ছে, বাশার আল-আসাদ সুন্নী নয়, আলাভী। কিন্তু যে সৌদি বাহরাইনের রাজতন্ত্রকে শিয়া বিদ্রোহীদের হাত থেকে রক্ষা করেছে, সেই বাহরাইনের রাজাওতো সুন্নী। অথচ বাহরাইনের ৬০% অধিবাসী শিয়া। মূলত সৌদি আরব সিরিয়ার বিদ্রোহীদের সমর্থন দেওয়ার কারণ হলো, সিরিয়া মার্কিন ব্লকের সৌদি আরবকে পাত্তা দেয় না। তার সাথে সুসম্পর্ক রয়েছে রুশ ব্লকের ইরানের সাথে। তাছাড়া চীনের সাথেও সিরিয়ার সম্পর্ক ভালো। আর ফ্রান্স ও আমিরাত সরকারেের মত শক্তিও আসাদের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হয়নি যেমনটা গাদ্দাফীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে।

৩. সত্য হলো, জায়ো-মার্কিন চক্র বা সৌদি-আমিরাত জোটকে আল্লাহ এত শক্তি দেননি যে, পৃথিবীতে তারা যা চাইবে তাই ঘটবে। স্বাধীনতাপন্থী বাঙ্গালীদের প্রতি প্রতিবেশী ভারত ও দূরের সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন থাকায় ১৯৭১ সালে আমেরিকা ও চীনের সমর্থন পেয়েও পাকিস্তানের মত শক্তিশালী দেশ বাংলাদেশে টিকে থাকতে পারেনি। তুরস্ক, ইরান ও কাতারের শাসকরা যেমন বোকা নন, তেমনি তাদের প্রতি ইসলামপন্থী জনসাধারণের সমর্থন বিষয়টিও এসব চক্র-জোট ভালো করেই জানে। তাই তারা নিজের মসনদকে ঝুঁকিতে ফেলে তুরস্ক, ইরান ও কাতার সরকারের পতন ঘটাতে প্রস্তুত নয়। তারা আপাতত শীতল যুদ্ধই চালিয়ে যেতে চায়। সৌদি-আমিরাত জোট ইয়েমেন ও লিবিয়া উভয় দেশে এই নীতিতেই কাজ করছে। কাসেম সোলাইমানীকে আমেরিকা দেশের বাইরে (বাগদাদে) হত্যার সাহস করলেও ইরানে ঢুকে তা করতে বলে মনে হয় না। কারণ, এতে ইরান সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের লজ্জায় ক্ষিপ্ত হয়ে তাৎক্ষণিক কোনো একশনে যেতো।

সত্যের সত্য হলো, দুনিয়াটা আগেও, এখনও ও ভবিষ্যতেও স্রষ্টা মহানের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং এখানে তাঁর ইচ্ছাই চূড়ান্ত। তিনি কোনো ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রকে সীমালঙ্ঘনের অবকাশ দেওয়ার অর্থ কখনো এই নয় যে, তিনি তাদেরকে সকল কামনা-বাসনা পূরণ করার সুযোগ দিয়েছেন। এরকম হলে স্বৈরচার গাদ্দাফীর করুণ মৃত্যু, সাদ্দামের করুণ মৃত্যু, তিউনিসিয়ার বেন আলী, মিসরের মোবারকে ও ইয়েমেনের সালেহের করুণ পতন ঘটত না।
সো, হে মুমিন! সৎ ও ন্যায়ের পথে থেকে জীবন-জীবিকার সকল বিষয়ে আল্লাহর উপর আস্থা রাখুন এবং তাঁর জন্য তাঁর পথে ধৈর্যধারণ করুন। দেখবেন, আপনার ক্ষুধা ও বঞ্চনার জীবনই ওদের ভোগ-দখলময় জীবনের চেয়ে অধিক পরচ্ছিন্ন ও বেশী ইজ্জতময় হয়েছে।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে ঈমান, আমল ও আখলাকের উত্তম পথে উঠার তৌফীক দান করুন।

আবুল হুসাইন আলেগাজী
সদর লোহগাড়া, চট্টগ্রাম।

পোষ্টটি ভালো লেগে থাকলে আপনার মূল্যবান মতামত জানান প্লিজ!
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Comment