“আমি যার মওলা, এই আলীও তার মওলা”- ডক্টর আব্দুল বাতেন মিয়াজী

পোষ্টটি অন্যকে পড়ার সুযোগ করে দিতে শেয়ার করুন প্লিজ।

লক্ষাধিক সাহাবা রাঃ’র সামনে রাসূল [ﷺ] জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আমার সাহাবাগণ, তোমরা কি জানো, আমি মুমিনদের নিজেদের জীবনের চাইতেও অতি আপন?’ লক্ষাধিক সাহাবা সমস্বরে উত্তর দিলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা জানি, আপনি আমাদের নিজেদের জীবনের চাইতেও অতি আপন’। এরপর মদিনা-মুনিব আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আমার প্রিয় সাহাবাগণ, তোমরা কি জানো, আমি তোমাদের সবার জীবনের অধিকারী (হাকিম অর্থাৎ মুমিনদের জীবনের উপর আজীজ বা ক্ষমতাশালী)’। আবারো লক্ষাধিক সাহাবা সমস্বরে উত্তর দিলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা জানি ও মানি’।

গাদিরে খুমে নিজের বেলায়েতের এবং অভিভাবকত্বের ঘোষণা দেবার পর রাউফুর রাহীম রাসূল [ﷺ] মওলা আলী আলাইহিস সালাম ওয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর হাত ধরে উপরে তুলে লক্ষাধিক সাহাবার উদ্দেশ্যে আবারো পূর্বের প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করলেন, ‘তোমরা কি সাক্ষ্য দিচ্ছ যে, আমি তোমাদের সবার জীবনের আওলা অর্থাৎ অভিভাবক?’ সবাই আবারো একইভাবে তা স্বীকার করে সম্মতিসূচক উত্তর দিলেন, ‘আপনি সত্য বলছেন ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি সমস্ত মুমিনদের জীবনের অলি বা অভিভাবক’। এবার রাসূল-প্রিতম ঘোষণা করলেন, ‘তাহলে শোনো, আমি যার মওলা, এই আলীও তার মওলা। [مَنْ كُنْتُ مَوْلَاهُ فَهذاعَلِيٌّ مَوْلَاهُ – মান কুনতু মাওলাহু ফাহাজা আলিয়্যুন মাওলাহু]।

এই ঘোষণার ব্যাখ্যায় শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শায়খুল ইসলাম প্রফেসর ডক্টর তাহিরুল কাদরী মা জি আ এই সংক্রান্ত বিভিন্ন হাদিসের আলোকে বলেন, এই ঘোষণার অর্থ হলো, ‘হে ঈমানদারগণ, আমি যার জীবনের মওলা, এই আলীও তার জীবনের মওলা বা অভিভাবক। আমাকে যারা অভিভাবক মানো, তোমরা এই আলীকেও অভিভাবক মানো। যে আলীকে মওলা মানে না, সে আমাকেও মওলা মানে না।’

অর্থাৎ এই মওলা মানে এখানে বন্ধু নয়, কেননা, নবীজী সাহাবাগণের বন্ধু ছিলেন না, তিনি এটা আগেই পরিষ্কার করে নিয়েছেন যে, তিনি সবার জীবনের অধিকারী, অভিভাবক এবং সবার উপর ক্ষমতাশীল। তবে শিয়াদের মতে এর অর্থ খলিফাও নয়। কেননা, নবীজী খলিফা ছিলেন না। নবীজী [ﷺ] কুল কায়েনাতের সবার মওলা বা অভিভাবক, কাজেই মওলা আলী আলাইহিস সালামও কুল কায়েনাতের মওলা বা অভিভাবক।

এ ঘোষণা দেবার পর আমাদের আঁকা [ﷺ] হাত উত্তোলন করলেন এবং আল্লাহ্‌ পাকের নিকট প্রার্থনা করলেন, “হে আল্লাহ্‌, যে আলীকে অলি মানে, তুমি তার অলি হয়ে যাও। আর যে আলীর প্রতি দুষমনি রাখে, তুমি তার দুষমন হয়ে যাও। যে আলীকে সাহায্য করে, তুমি তাকে সাহায্য করো। যে আলীকে মন্দ ভাবে তুমি তাকে লাঞ্ছিত করো। যে আলীকে ভালোবাসে, তুমিও তার প্রিয় হয়ে যাও। যে আলীর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, তুমিও তার সাথে শত্রুতা পোষণ করো।”

উল্লেখ্য, নবীগণের দোয়া আল্লাহ্‌ পাক ফিরিয়ে দেন না। নবীগণের দোয়া মকবুল অর্থাৎ নিশ্চিত কবুল হয়। রাসূল [ﷺ] জানতেন, তাঁর বিদায়ের পর মওলা আলীর সাথে কী আচরণ করা হবে। তিনিও এও পরিষ্কার জানতেন, তাঁর বিদায়ের পর আহলে বাইত আতহারগণের সাথে কী আচরণ করা হবে। আর তাই তিনি বারবার আহলে বাইত এবং বিশেষ করে মওলা আলীর সাথে বুঝেশুনে আচরণ করার জন্য তাগিদ দিয়েছেন। মুস্তাদরাকে আলাস সাহিহাইনে ইমাম হাকিম নিশাপুরি রহঃ সহীহ সনদে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন, “হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুযূর পাক [ﷺ] ইরশাদ করেন, কোনো ব্যক্তি যদি সম্মানিত রুকন এবং সম্মানিত মাক্বামের মধ্যবর্তী স্থানে সারিবদ্ধ হয়ে থাকে। অতঃপর নামায পড়ে এবং রোযা রাখে, কিন্তু এই অবস্থায় তার মৃত্যু হয় যে, সে আহলে বায়েতের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। তাহলে সে অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (মুস্তাদরাকে হাকীমঃ ৪৭৬৬, যাখাইরুল উক্ববা লি-মুহিব্বে ত্ববারী ১/১৮, হাদিসের মান সহীহ)

সহীহ বুখারি ও সহীহ মুসলিমে একটি হাদিসে সাহাবাগণের কয়েকজনকে হাউযে কাউসারের কিনার থেকে তাড়িয়ে দেবার কথা উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ বাহ্যিকভাবে তারা সাহাবাই ছিল, এবং অনেকে তাদেরকে সাহাবা হিসেবেই জানে কিন্তু মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তাদের সাহাবিয়ত পরিপূর্ণ ছিল না। ফলে তাদেরকে সাহাবা হিসেবে পরকালের মুক্তির যে ওয়াদা আল্লাহ্‌ পাক করেছেন তারা তা থেকে বঞ্চিত হবে। দেখুন হাদিসটি এবারতসহঃ
عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏أَنَا فَرَطُكُمْ، عَلَى الْحَوْضِ، وَلَيُرْفَعَنَّ رِجَالٌ مِنْكُمْ ثُمَّ لَيُخْتَلَجُنَّ دُونِي فَأَقُولُ يَا رَبِّ أَصْحَابِي‏.‏ فَيُقَالُ إِنَّكَ لاَ تَدْرِي مَا أَحْدَثُوا بَعْدَكَ‏”‏.

অর্থঃ আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) সূত্রে নবীজী [ﷺ] থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ “আমি তোমাদের আগে হাউয-এর কাছে গিয়ে পৌছব। আর (ঐ সময়) তোমাদের কতিপয় লোককে নিঃসন্দেহে আমার সামনে উঠানো হবে। আবার আমার সামনে থেকে তাদেরকে পৃথক করে নেয়া হবে। তখন আমি আরয করব, প্রভু হে! এরা তো আমার সাহাবা। তখন বলা হবে, ‘তোমার পরে এরা কি কীর্তি করেছে তাতো তুমি জানো না’।” [বুখারি – ৬১২৭ ইঃ ফাঃ] অন্য একটি বর্ণনায় সাহাবী শব্দের স্থানে উম্মাতী উল্লেখ করা হয়েছে।

কাজেই কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ্‌ তাদের অলি, যারা আলীকে অলি মেনেছে। যারা আলীকে অলি মেনেছে তারা নবীজী [ﷺ] এঁরও অলি। যারা আলী আলাইহিস সালামের প্রতি শত্রুতা পোষণ করেছে তারা খোদ আল্লাহ্‌ ও আল্লাহ্‌র রাসূল [ﷺ] এর দুশমন হিসেবে পরিগণিত হবে। গাদিরে খুমের ঘোষণার পর হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এবং উমর ফারুক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সবার আগে উঠে এসে মওলা আলী আলাইহিস সালামের হাত ধরে তাঁকে মুনিনদের মওলা হিসেবে অভিভাদন জানান এবং তাঁকে নিজেদের মওলা বলে মেনে নেন।

আল্লাহ্‌ পাক আমাদেরকে আহলে বাইতের একনিষ্ঠ প্রেমিক হিসেবে কবুল করুন এবং আহলে বাইতের প্রতি যারা দুষমনি রাখতো তাদের থেকে আমাদেরকে হেফাজত করুন। আমীন।
বি দ্র ১৮ জিলহজ সেই গাদিরে খুম দিবস।

ভালো লেগে থাকলে লেখাটি শেয়ার করে অন্যকে পড়ার সুযোগ করে দিন। ধন্যবাদ

পোষ্টটি ভালো লেগে থাকলে আপনার মূল্যবান মতামত জানান প্লিজ!
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Comment