ভারতে এক্সাক্টলি কী হচ্ছে :: আসামের বাঙালি মুসলিম এবং সেদিনের মঙ্গোলিয়া – গোলাম লিসানী দস্তগীর

পোষ্টটি অন্যকে পড়ার সুযোগ করে দিতে শেয়ার করুন প্লিজ।

(বিষয়গুলো আমাদের জানা থাকা খুবই দরকার। ছোট ছোট স্ট্যাটাস না দিয়ে একবারে পোস্ট করছি, যেন কপি ও পোস্ট করার সুবিধা হয়।)

একদিন, মঙ্গোলিয়ার বিস্তার ছিল জাপানের কোণা থেকে শুরু করে ইউরোপ পর্যন্ত। অবিশ্বাস্য বড়। মঙ্গোলরা জাপানকে দখল করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। অতদূর প্রায় ইউরোপ চলে গেছে, ঘরের কোণায় জাপানকে পরাস্ত করতে পারেনি, কেমন না?

৪,৪০০ যুদ্ধজাহাজ নিয়ে জাপান আক্রমণ করেছিল মঙ্গোলরা।
সেদিনই পারেনি, আর আজকে মঙ্গোলিয়ার নৌবাহিনীর কী অবস্থা জানেন? মঙ্গোলিয়ার নৌবাহিনীতে আজকে একটা টাগবোট আছে (জাহাজ-টানা নৌকা)। সেই টাগবোটে সর্বসাকুল্যে ৭ জন চাকরি করে। এদের মধ্যে ৬ জন সাঁতার জানে না।

ভারত দেশটার প্রতি আমাদের কোন রাগ নেই। কোন ক্ষোভ নেই ভারতের অধিবাসীদের প্রতিও।

মোদি-অমিতের ভারত প্রথমে নাগরিক নয়- এমন মানুষের তালিকা করতে এলো। সেই তালিকায় আসামে সাড়ে ৫ লাখ বাঙালি হিন্দু ছিল।

এবার আইন করল, যারা বাংলাদেশ-পাকিস্তান-আফগানিস্তান থেকে আসা সংখ্যালঘু (অমুসলিম) শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেবে।

এই আইন এক আসামেই ১১ লাখ মুসলিমকে রাষ্ট্রহীন করে দিল। আর সেই সাড়ে পাঁচ লাখ বাঙালি হিন্দুকে একটা রাষ্ট্রপরিচয় দিল। আসামের সাড়ে পাঁচ লাখ বাঙালি হিন্দুর সাথে একাত্ম্যবোধ করি। রাষ্ট্র পাবার অধিকার মানুষের অধিকার একেবারে বেসিক অধিকার। পরিচয়ের অধিকার একেবারে বেসিক অধিকার। মানবিক অধিকার। এই সাড়ে পাঁচ লাখ বাঙালি হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে অভিনন্দন। আর বাকী ১১ লাখ মুসলিম হয়েছ তো, কপালে এসব থাকবেই।

এনআরসি তারা পশ্চিমবঙ্গেও করবে, সারা ভারতে করবে- যদি বিজেপি ক্ষমতায় থাকে, করবে। এনআরসির চাপে ভারতের প্রকৃত অধিবাসী অনেক মুসলিম তার নাগরিকত্ব হারিয়েছে। এমনকি অবসরপ্রাপ্ত, যুদ্ধে প্রতীকপ্রাপ্ত পুরস্কৃত ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যও অনাগরিক সাব্যস্ত হয়েছে। চৌদ্দ পোস্তান ভারতীয়, জন্ম ভারতে, তার চোদ্দ পোস্তানের কেউ কোনদিন বাংলাদেশ দেখেওনি- এমন অসংখ্য মুসলিম এখন তার নাগরিকত্ব হারিয়ে বসে আছে এবং সামনেও আরো হারাবে।

এই এনআরসি তাদেরকে রাষ্ট্রহীন করেছে, যারা সীমানার ওইপার এইপাড়ে বিয়ে করেছিল। তাদের ছেলেমেয়েদের রাষ্ট্রহীন করেছে, তাদের নাতিপুতিদেরও রাষ্ট্রহীন করেছে। এমনো বৃদ্ধা আছেন, যিঁনি মৃত্যুর প্রহর গুণছেন, এত বৃদ্ধা। তিনিও বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তপাড় বিয়ের ফলে আজকে অনাগরিক!

এই অনাগরিকত্ব আবার কিন্তু শুধু মুসলিমদের জন্য। অন্য কারো জন্য নয়।

এখন, এই আইন কেন শুধু বাংলাদেশ-আফগানিস্তান-পাকিস্তানের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সমূহের জন্য?

চীনের সাথে কি ভারতের সীমানা নেই? চীন-ভারত সীমানাসংশ্লিষ্ট অঞ্চলে কি মুসলিমরা নির্যাতিত নয়? যদি বাংলাদেশ পাকিস্তান আফগানিস্তানের নির্যাতিত সকল হিন্দু-বৌদ্ধ-জৈন-শিখ-খ্রিস্টান ভারতে অবস্থানস্বরূপ নাগরিকত্ব পেতে পারে, তবে ভারত সীমায় পড়া চৈনিক মুসলিমরা কি মানুষ না? হিন্দুও মানুষ, বৌদ্ধও মানুষ, জৈনও মানুষ, খ্রিস্টানও মানুষ। স্রেফ মুসলিম মানুষ না?
ভারতের সাথে কি মিয়ানমারের সীমা নেই? মিয়ানমার থেকে কি ভারতে রোহিঙ্গা মুসলিম এবং হিন্দুরা যায়নি? মিয়ানমারে কি মুসলিমরা সংখ্যালঘু নয়? কেন মিয়ানমারের সংখ্যালঘুরা ভারতে আশ্রয় এবং নাগরিকত্ব পাবে না? নেপাল-ভূটান-শ্রলীংকায় কি মুসলিমরা সংখ্যালঘু নয়? তারা যদি এবং যখন অত্যাচারিত হবে, তখন তারা ভারতে আশ্রয় নিলে কেন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-শিখ-জৈনের মত আরো একজন মানুষ হিসাবে নাগরিকত্ব পাবে না?

তার উপর, একটা দেশে মানুষ কি শুধু নির্যাতিত হয় ধর্ম পরিচয়ের ভিত্তিতে? ৭১ সালে তাহলে বেশিরভাগ মুসলিম কেন ছিল ভারতের বুকে শরণার্থী? ধর্মে সংখ্যালঘু না হয়েও মানুষ মতে সংখ্যালঘু হতে পারে, রাজনৈতিক দর্শনে সংখ্যালঘু হতে পারে, সামাজিকভাবে তার দেশে ফিরে যাওয়া অসম্ভব হতে পারে। সেখানে কেবলমাত্র এবং শুধুমাত্র ধর্মীয় নির্যাতিতদের কে স্থান দেয়া হচ্ছে এবং সামাজিক নির্যাতিতদের বা রাজনৈতিক নির্যাতিতদের কেন নয়?

খুব স্পষ্ট মেসেজ দিচ্ছে মোদি-অমিত।
ভারত শুধু হিন্দুর। এখানে মুসলিমের কোন জায়গা নেই।
মোদিত্বের ভারত এমন একটা রাষ্ট্র যা সারা পৃথিবীর সব দেশের সব হিন্দুর।
কিন্তু খোদ ভারতীয় মুসলিমের নয় সেই বিজেপিত্বের রাষ্ট্রটা।

বাকী সম্প্রদায়গুলোকে নামের লিস্টিতে রাখা হয়েছে স্রেফ আইওয়াশ হিসাবে।

কারণটা স্পষ্ট, পুরো বিষয়টাই শুধু ভারতীয় মুসলিমদের দেশছাড়া করা এবং অন্যদেশ থেকে হিন্দুদের ভারতে এনে উগ্র জাতীয়তাবাদী হিন্দুত্ববাদের জড় চিরতরে পোক্ত করার পরিকল্পনার অংশ।

খুব সহজ পরিকল্পনা,
১. মুসলিমদের মধ্যে যতজনের নাগরিকত্বের প্রমাণে দুর্বলতা আছে, যেমন অশিক্ষিত দরিদ্ররা- তাদের অনাগরিক করে বাংলাদেশে পাঠানো।
২. মুসলিমসংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো থেকে তাদের জায়গায় হিন্দু আনা।
৩. আরো হতদরিদ্রদের ঘর ওয়াপসির মাধ্যমে হিন্দুকরণ।
৪. যাদের ঘর ওয়াপসি (হিন্দুকরণ) হবে না, তাদের শরিয়াহ পালনের সব সুযোগ থেকে বঞ্চিতকরণ, অভিন্ন ‍আইন প্রণয়নের মাধ্যমে।
৫. মুসলিমদের রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক সব সুবিধা রহিতকরণ- যেমন কাশ্মীরে জমির অধিকার, দলিত সম্প্রদায় থেকে মুসলিম হওয়া মানুষের দলিত পরিচয়ের সুবিধাসমূহ, সংখ্যালঘুর কোটা ও অন্যান্য সুবিধা।
৬. মুসলিমদের সব ধরনের পরিচয় মোছা- যার অংশ হিসাবে স্থানের নামকরণ এবং মুসলিম স্থাপত্যগুলোর সংরক্ষণ ও সংস্কার বিনষ্ট করা হচ্ছে।
৭. এই সবকিছুর মাধ্যমে এমন একটা অসহ্য চাপ সৃষ্টি করা যেন মুসলিমরা আইনের চাপে পড়েই বেরিয়ে যায়, সামাজিক এবং অসামাজিক চাপ তো আছেই।
৮. সবশেষে জনসংখ্যার অনুপাতে মুসলিমদের যথা সম্ভব কমিয়ে ফেলা।

এখন কী হবে আমরা জানি না।
অলরেডি তিন চার সপ্তাহ হয়ে গেল ভারতীয় মুসলিমরা বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করছেন। বাংলাদেশ বেশ কড়াভাবে পাহারা দিতে চাচ্ছে। প্রতিদিন শরণার্থীর ভিড় বাড়ছে। বিশেষ করে অমিত বিলটা পাশ করানোর পর থেকে স্রোতের মত বাংলাদেশের দিকে আসা শুরু করেছে মুসলিমরা।

এদিকে পরপর দু’বার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে রীতিমত অসৌজন্যমূলকভাবে গুরুত্বপূর্ণ‍ কেউ রিসিভ করতে যায়নি ভারতের এয়ারপোর্টে। একদিনে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর বাতিল থেকে আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারি, ভারতই তাদের স্বাগত জানাতে অনিহা প্রকাশ করেছে।

মোদি-অমিতের উগ্রবাদ যে শেখ হাসিনার বাংলাদেশকেও ছাড় দিবে না, বাংলাদেশ ভারতকে এতকিছু দেয়ার পরও তা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিল। মিয়ানমার পেঁয়াজ পায়, বাংলাদেশ পায় না। বাংলাদেশ তো ভারতের জন্য মিয়ানমার থেকে কম করেনি! শেষ পর্যন্ত মোদি-অমিতের কাছে বাংলাদেশের হিন্দুবান্ধব সরকারের কোন মানেই নেই। কারণ তাদের বাংলাদেশকে বলির পাঠা বানাতে হবে, এখানে যে-ই থাকুক।

এখন অনেক কিছুই হতে পারে।
আমার ধারণা কিছুদিন আসতে বাঁধা টাঁধা দিয়ে তারপর বাংলাদেশ ক্ষান্ত দিবে। আর ভারত থেকে ১১ লাখ মুসলিম আসবে সেটা ভাবারও কোন কারণ নেই। আসাম থেকেই আসার চেষ্টা করবে ১১ লাখ বাদ পড়া। যারা বাদ পড়েনি, তারা অনেকে আসবে সামাজিক চাপে পড়ে। শরণার্থী কোটি ছাড়ানো খুবই স্বাভাবিক। কারণ ভারত থেকে অন্তত ১ কোটি মুসলিম বেরোনোর সর্বাত্মক চেষ্টা করবে, আর পাকিস্তানে তারা ঢুকতে পারবে না।

আমাদের উপর চাপ পড়বে।
দেশের স্ট্রাকচার বদলে যেতে পারে। খাদ্যসংকট দেখা দিবে। সামাজিক অস্থিরতা, রাহাজানি, নিত্যপণ্য দুর্লভ হয়ে যাবে।

কিন্তু কেউ যদি মনে করে এসব পরিস্থিতিতে পড়লে ভারতের উপর সারা পৃথিবী হামলে পড়বে- কেউ কিছু করবে, তা বোকার স্বর্গ। বাংলাদেশে ২০ লাখ রোহিঙ্গা আগে থেকেই আছে। অন্তত ২০ লাখ ভারতীয় মুসলিম যারা নিজেদের পাকিস্তানি মনে করে, আগে থেকেই আছে।

বাংলাদেশে আরো ১ কোটি মুসলিম এসে পড়লে কেউ কিছুই করবে না। জাতিসংঘ মাঝে মধ্যে নায়িকা গায়িকা পাঠাবে। কিছু ডলার পাঠাবে। আর মিটিংওলা আমলা পাঠাবে।

বাংলাদেশও যে কিছু করতে পারবে, তা না।
উত্তাপ বাড়বে। ভারতের সাথে ”সম্পর্ক” খারাপ হয়ে কেটে যাবে। সীমান্তে গোলাগুলি হবে। মাঝখান দিয়ে ভাল হবে, বাংলাদেশের মানুষের ভারত কেনাকাটা করতে যাবার বাতিক কমবে। সুযোগ থাকবে না।

হয়তো বাংলাদেশ থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের বেশ কিছু মানুষ ভারত চলে যাবে, কারণ এখন গেলেই খোলা হাতে মোদি দাঁড়িয়ে রয়েছে আর কে না জানে, ভারতে খাবার, পোশাক, শিক্ষা এমনকি জমিজমা বাড়িগাড়ি পর্যন্ত সস্তা। সস্তায় থাকা মানে আরামে থাকা, আর সাম্প্রদায়িক হয়ে, অতপর সংখ্যাগরিষ্ট হয়ে থাকার মধ্যে ব্যাপক মজাও আছে।

পাশাপাশি বাংলাদেশে হিন্দু-বিদ্বেষ বেড়ে যাবারও সম্ভাবনা আছে। সামাজিকভাবে উগ্র মুসলিম জাতীয়তাবাদ আরো বেড়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। জঙ্গীবাদের গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যাবে ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তানের মুসলিমদের মধ্যে।

নৈতিকভাবে রাষ্ট্রের দিক থেকে মনে করি, পৃথিবীর যে কোন জাতির যে কোন ধর্মের মানুষের বাংলাদেশে এসে মানবিক আশ্রয় নেয়ার অধিকার রয়েছে।
আর ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তো স্রেফ একটাই কথা, শুধু মুসলিম পরিচয়ের জন্য যদি কেউ রাষ্ট্রছাড়া হয়, তাকে আশ্রয় দিলে যে খুব আরামে থাকতে পারব আমরা তা নয়, কিন্তু সবাই মিলে এই কষ্টটায় শামিল হওয়া ছাড়া কিছু করার নেই। নইলে সীমান্তের ওপাড়ে গুলি করে এদের মারা যায় বড়জোর।

জানি না মোদি-অমিতের পতন হবে কিনা আশু। বুঝছি ভারতের অর্থ
নৈতিক বিপর্যয় হবে, তাতে কী হবে জানি না। জানি না ভারতের ভেতরে এই ক্যান্সার মানুষের মন থেকে মুছতে কতদিন লাগবে।
জানি না সামনে কত ধরনের ভোগান্তি অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের নাগরিকদের এবং আশপাশের অঞ্চলের মুসলিমদের।
জানি না, যুদ্ধ টুদ্ধও বেধে যাবে কিনা- যদিও সম্ভাবনা প্রায় নেই-ই।

এটুকু বুঝতে পারছি, এই পরিস্থিতিতে আমাদের আশু স্বস্তি নেই। বাংলাদেশেও আর্থিক বিপর্যয় হতে পারে। হয়তো হাসিনা চীন বা আমেরিকামুখী হয়ে পড়তে পারেন, দেশে এদের কারো ঘাঁটি হতেও পারে। বা দেশের সরকারব্যবস্থাই পালটে যেতে পারে।

তবে একটা কথা জানি, মহাকাল এক রকম থাকে না। থাকবে না। যে মঙ্গোলিয়া ৪,৪০০ যুদ্ধজাহাজ নিয়ে জাপান আক্রমণ করেছিল, তাদের নৌবাহিনীর নাবিক এখন ৭ জন, তাদের মধ্যে ৬ জন সাঁতার জানে না। মোদি-অমিত এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা ভারতের জন্য সেই ধরনের দিন নিয়ে আসছে সম্ভবত।

[বি.দ্র.: লেখাটি বেশি বেশি শেয়ার করুন, কপি করে অবিকৃতভাবে পোস্ট করুন আপনার মতামত নিচে পোষ্ট করুন প্লিজ।

পোষ্টটি ভালো লেগে থাকলে আপনার মূল্যবান মতামত জানান প্লিজ!
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Comment