হিন্দুদের পূজায় আমাদের বাণী কেমন হওয়া উচিত? — ডক্টর আব্দুল বাতেন মিয়াজী

আল্লাহ্ পাকের কাছে প্রথমেই দোয়া করি—তিনি যেন আমাদের সবাইকে হেদায়েত দান করেন, শিরক ও নাফরমানি থেকে হেফাজত করেন এবং সত্য কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রতি ন্যায় ও সৌজন্য বজায় রাখার তাওফিক দেন। আমিন।
কিছুদিন ধরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এমন কিছু বক্তব্য শোনা যাচ্ছে—
‘গোটা পৃথিবীতে যখন অন্যায় নেমে এসেছিল, তখনই দেবী দুর্গার আবির্ভাব হয়েছিল।’
‘দুর্গাপূজা শুধু হিন্দুদের একার নয়, এটা আমাদেরও অংশ।’
‘দুর্গাপূজা পুরো বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ উৎসব।’
‘মা দুর্গা এ ধরায় নেমে আসেন অন্যায়-দুঃশাসন দূর করার জন্য।’
‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।’
কথাগুলো শুনে একজন মুসলমানের মনে প্রশ্ন জাগে—রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তি কি অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, নাকি এমন ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে নিজেকে এক করে ফেলছেন, যা ইসলামের তাওহীদের সঙ্গে মেলে না?
প্রশ্নটি কোনো ধর্মের মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়। বরং নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের সীমারেখা স্পষ্ট রাখার জন্য।
ধর্মীয় স্বাধীনতা আছে—বিশ্বাসের আপসও কি জরুরি?
বাংলাদেশে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও এ দেশে সনাতন ধর্মাবলম্বী, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন। তাঁদের সবারই নিজ নিজ ধর্ম ও ধর্মীয় আচার শান্তিপূর্ণভাবে পালনের অধিকার আছে। রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা নাগরিক সম্প্রীতি ও নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত হতে পারেন। কিন্তু অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকা আর সেই ধর্মের উপাসনা বা বিশ্বাসকে নিজের বলে প্রকাশ করা এক বিষয় নয়।
মুসলমান হিসেবে আমাদের কথা ও কাজ কুরআন-সুন্নাহর সীমার মধ্যে থাকা উচিত। কোনো দেবদেবীকে আল্লাহর মতো ক্ষমতাবান মনে করা, তাঁর কাছে ইবাদতের অর্থে প্রার্থনা করা, অথবা তাঁকে অলৌকিকভাবে মানুষের ভাগ্য ও বিপদ দূর করার ক্ষমতার অধিকারী বলা ইসলামী আক্বীদার সঙ্গে মেলে না। কোনো বক্তব্য যদি আক্ষরিক ধর্মীয় অর্থে এসব বোঝায়, তবে একজন মুসলিমের পক্ষে তা নিজের বিশ্বাস হিসেবে বলা সমীচীন নয়।
ইবাদত ও চূড়ান্ত সাহায্য একমাত্র আল্লাহ্র কাছে
আমরা প্রতিদিন সূরা ফাতিহায় বলি—আমরা একমাত্র আল্লাহ্রই ইবাদত করি এবং তাঁরই কাছে সাহায্য চাই।
[সূরা আল-ফাতিহা, ১:৫]
কুরআনে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের মুখে মূর্তিপূজারীদের উদ্দেশে প্রশ্ন এসেছে: তোমরা কি আল্লাহ্কে ছেড়ে এমন কিছুর উপাসনা করছ, যা তোমাদের কোনো উপকারও করতে পারে না, ক্ষতিও করতে পারে না?
[সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৬৬]
আরেক আয়াতে আল্লাহ্ ছাড়া এমন কাউকে ডাকার নিষেধ এসেছে, যে উপকার বা ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে না। এরপর বলা হয়েছে—আল্লাহ্ যদি কাউকে কষ্টে ফেলেন, তিনি ছাড়া তা দূর করার কেউ নেই; আর তিনি কল্যাণ চাইলে তাঁর অনুগ্রহ ঠেকানোরও কেউ নেই।
[সূরা ইউনুস, ১০:১০৬–১০৭]
কুরআনের এই শিক্ষা আমাদের কাছে স্পষ্ট: ইবাদত, দোয়া এবং গায়েবি ও চূড়ান্ত সাহায্যের জন্য একমাত্র আল্লাহ্র দিকেই ফিরতে হবে। কোনো দেবদেবী, মূর্তি বা সৃষ্টিকে আল্লাহ্র সমকক্ষ মনে করা, কিংবা তাদের এমন ক্ষমতার মালিক ভাবা যা কেবল আল্লাহ্র—ইসলামী আকিদার সঙ্গে তা মেলে না।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি: মানুষের কাছ থেকে স্বাভাবিক, সামর্থ্যের মধ্যে থাকা দুনিয়াবি সাহায্য চাওয়া শিরক নয়। কুরআনে হযরত মূসা আলাইহিস সালামের কাছে একজন মানুষ সাহায্য চেয়েছিল—তিনি তাকে সাহায্য করেছিলেন।
[সূরা আল-কাসাস, ২৮:১৫]
অতএব, আলোচনাটি মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা নিয়ে নয়; আলোচনাটি ইবাদত, দোয়া এবং আল্লাহ্র একক ক্ষমতার বিষয়ে।
মূর্তিপূজার সূচনা: নূহ আলাইহিস সালামের কওমের শিক্ষা
কুরআনে হযরত নূহ আলাইহিস সালামের কওমের কথা এসেছে। তিনি তাঁদের এক আল্লাহ্র ইবাদত করতে আহ্বান করেছিলেন। তাঁর কওমের কিছু মানুষ নিজেদের উপাস্যদের আঁকড়ে ধরে রাখতে বলেছিল; তাদের মধ্যে ওয়াদ্দ, সুওয়া, ইয়াগূস, ইয়াউক ও নাসর নামগুলোও ছিল।
[সূরা নূহ, ৭১:২৩]
সহিহ বুখারীতে আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এই নামগুলো নূহ আলাইহিস সালামের কওমের কিছু নেককার মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। তাঁরা মারা যাওয়ার পর শয়তান তাঁদের স্মরণে মূর্তি বা প্রতীক স্থাপনের প্ররোচনা দেয়। পরে জ্ঞান হারিয়ে গেলে মানুষ সেগুলোর উপাসনা শুরু করে।
[সহিহ আল-বুখারী, কিতাবুত তাফসীর, হাদিস ৪৯২০]
এখানে আমাদের জন্য বড় শিক্ষা আছে। কোনো নেককার মানুষকে স্মরণ করা আর তাঁকে উপাসনার মর্যাদা দেওয়া এক কথা নয়। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা যখন ইবাদতের সীমা অতিক্রম করে, তখন মানুষ তাওহীদ থেকে বিচ্যুত হতে পারে।
নমরূদ ও ফেরাউন: ক্ষমতার অহংকারও মানুষকে সীমা ছাড়ায়
কুরআনে এক ক্ষমতাবান শাসকের সঙ্গে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের বিতর্কের কথা এসেছে। আল্লাহ্র দেওয়া রাজত্ব পেয়ে সে নিজেকে এমন ক্ষমতাবান ভাবতে শুরু করেছিল যে জীবন ও মৃত্যুর মালিকানা নিয়েও তর্ক করে। তখন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাকে বলেন—আল্লাহ্ সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে আনেন; তুমি তা পশ্চিম দিক থেকে আনো। কুরআন ওই শাসকের নাম উল্লেখ করেনি; তাফসিরি ঐতিহ্যে তাকে নমরূদ বলা হয়।
[সূরা আল-বাকারা, ২:২৫৮]
ফেরাউন আরও স্পষ্টভাবে বলেছিল—‘আমি তোমাদের সর্বোচ্চ প্রতিপালক।’
[সূরা আন-নাযিআত, ৭৯:২৪]
কুরআনে তার আরও একটি উদ্ধৃতি এসেছে—সে বলেছিল, ‘আমি তোমাদের জন্য নিজেকে ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য জানি না।’
[সূরা আল-কাসাস, ২৮:৩৮]
এগুলো শুধু অতীতের কাহিনি নয়। এগুলো ক্ষমতা, অহংকার ও মানুষের সীমালঙ্ঘনের পরিণতি সম্পর্কে সতর্কবাণী।
অবাধ্য জাতিগুলোর পরিণতি—কিন্তু কারও বিপর্যয় নিয়ে রায় নয়
কুরআনে নূহ আলাইহিস সালামের কওম, আদ ও সামূদসহ বিভিন্ন জাতির অবাধ্যতা, রাসূলদের অস্বীকার ও সীমালঙ্ঘনের পরিণতির কথা এসেছে। আল্লাহ্ বলেছেন, প্রত্যেককে তার অপরাধের কারণে পাকড়াও করা হয়েছিল; কারও ওপর ঝড়, কারও ওপর বিকট ধ্বনি, কাউকে ভূমিতে ধসিয়ে, আর কাউকে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
[সূরা আল-আনকাবূত, ২৯:৪০]
এই আয়াতগুলো আমাদের সতর্ক করে। তবে কোনো বর্তমান দুর্যোগ, জাতি বা ব্যক্তির ওপর আল্লাহ্র শাস্তির চূড়ান্ত রায় দেওয়ার অধিকার আমাদের নেই। সে জ্ঞান আল্লাহ্রই। আমাদের কাজ নিজের আকিদা ও আমল যাচাই করা, ন্যায়বিচার করা এবং মানুষের প্রতি সদাচরণ বজায় রাখা।
মতভেদ থাকলেও অসম্মান নয়
তাওহীদের বিষয়ে ইসলামের অবস্থান দৃঢ়। একই সঙ্গে কুরআন মুসলমানদের নিষেধ করেছে—আল্লাহ্ ছাড়া যাদের অন্যরা ডাকে, তাদের গালি দিতে; কারণ এতে অজ্ঞতাবশত আল্লাহ্কে গালি দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
[সূরা আল-আনআম, ৬:১০৮]
আর যারা ধর্মের কারণে মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করে না বা তাঁদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয় না, তাদের সঙ্গে সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ্ নিষেধ করেননি।
[সূরা আল-মুমতাহিনা, ৬০:৮]
তাই আমাদের অবস্থান হবে পরিষ্কার—আমরা শিরককে সমর্থন করি না, কিন্তু কোনো ধর্মাবলম্বী মানুষের অধিকারও অস্বীকার করি না। আমরা অন্যের উপাসনায় অংশ নিই না, কিন্তু কাউকে অপমানও করি না। রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে শুভেচ্ছা জানানো, নাগরিক নিরাপত্তার কথা বলা এবং ধর্মীয় আচারকে নিজের বিশ্বাস হিসেবে গ্রহণ করা—এই বিষয়গুলো এক করে দেখা ঠিক নয়।
মুসলমান জনপ্রতিনিধিদের প্রতি বিনীত অনুরোধ
আপনারা রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে সব নাগরিকের পাশে দাঁড়াবেন—এটাই দায়িত্ব। পূজামণ্ডপে গেলে অতিথি হিসেবে যান, নিরাপত্তা ও শান্তির কথা বলুন, মানুষের অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিন। কিন্তু এমন কথা বলবেন না, যাতে মনে হয় মুসলিম সমাজও দেবদেবীর উপাসনা বা তাদের অলৌকিক ক্ষমতার বিশ্বাসে অংশীদার।
‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’—কথাটি নাগরিক সৌহার্দ্য ও একে অপরের প্রতি শুভেচ্ছা অর্থে বলা হলেও ইসলামী আক্বীদার সাথে এর ভাবার্থ যায় না—প্রত্যেক ধর্মের উপাসনা ও বিশ্বাসে সবাই অংশ নেবে, এ ধারণা ইসলামের তাওহীদের সঙ্গে মেলে না। বাস্তবে
আমরা মুসলমান। আমাদের সৌজন্য হবে সুন্দর, আচরণ হবে ন্যায়ভিত্তিক, আর আকিদা হবে কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনায় অটল। অন্যের অধিকার রক্ষা করব—কিন্তু নিজের বিশ্বাসের সীমারেখাও ভুলব না।
আল্লাহ্ পাক আমাদের সবাইকে হেদায়েত দান করুন, শিরক ও নাফরমানি থেকে হেফাজত করুন এবং দেশকে শান্তি, ন্যায় ও পারস্পরিক সম্মানে সমৃদ্ধ করুন। আমিন।