যে ভূমি মুসলমানদের ছিলঃ স্পেন

পোষ্টটি অন্যকে পড়ার সুযোগ করে দিতে শেয়ার করুন প্লিজ।

– ডক্টর আব্দুল বাতেন মিয়াজী

ফরাসী বিপ্লবের পেছনে যে আদর্শ কাজ করেছে সে আদর্শের মূল তিনটি শ্লোগান ছিল ভ্রাতৃত্ব, সাম্য এবং স্বাধীনতা (Fraternity, Equality and Freedom)। এর সবগুলোই ইসলাম থেকে ধার করা। আর ইসলামের আদর্শ ইউরোপে পৌঁছেছে মূলত মুসলমানদের স্পেন জয়ের মাধ্যমে। যে সময়টাকে ইতিহাসে মধ্যযুগ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, সে সময়েই মুসলমানরা ইউরোপে স্বর্ণযুগের প্রবর্তন করেছিলেন। শিক্ষা, সংস্কৃতি, মুক্তচিন্তা আর মানুষের স্বাধীনতার যে বীজ মুসলমানরা ইউরোপে বপন করেছিলেন, তা ইউরোপবাসি এর আগে কখনো অনুভব করেনি। এক কথায় ইউরোপ ছিল তখন অশিক্ষা, কুসংস্কার, হানাহানি আর জাহেলিয়াতের সুতীব্র অন্ধকারে নিমজ্জিত। ইতিহাসে যাকে চিত্রায়িত করা হয় মধ্যযুগ হিসেবে আর সে যুগে ইউরোপের বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর সেই হানাহানিকে একত্রে বলা হয় “মুধ্য যুগীয় বর্বতা”।

মানুষের সম্মান বিশেষ করে নারীর সম্মান রক্ষার্থে স্পেন আক্রমণ

ভুমধ্য সাগর পারি দিয়ে মুসলমানরা কেন স্পেন জয়ে অগ্রগামী হল এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা যায় ধর্ষিতা এক নারীর সম্মান পুনরুদ্ধারে মুসলিম বাহিনী সেখানে অভিযান পরিচলনা করেন। কেননা, তখনকার মুসলিম শাসকদের কাছে মানুষের সম্মান রক্ষা ছিল অন্যতম দায়িত্ব। উল্লেখ্য, খলিফা জাফর আল-মানসুর এক মুসলিম নারীর ধর্ষিতা হবার শাস্তি স্বরূপ রোমানদের একটি শহর জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। কেননা, তখনকার রোমান সম্রাট ওইসব অপরাধীদের শাস্তি দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। আর স্পেন বিজয়ের সমকালীন ইউরোপে মানুষের অধিকার বলতে যা বোঝায় তার কিছুই ছিল না। দাস-ব্যবসা, ধর্মীয় মতভেদের কারণে অন্যকে হত্যা তখন ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।

স্পেন, পতুগাল আর ফ্রান্সের কিছু অংশকে একত্রে তখন বলা হতো হিস্পানিক (Hispanic)। এ অঞ্চলের রাজা ছিলেন রডারিক। তিনি যেমন ছিলেন অত্যাচারি তেমনি ছিলেন নীতিবহির্ভূত। কাউন্ট জুলিয়ান নামে এক ব্যক্তি মরক্কোর উপকূলে সিউটা অঞ্চলের অধিপতি ছিলেন। রডারিক এবং জুলিয়ান উভয়েই ছিলেন খৃষ্টান। সে সময়ের নিয়ম অনুযায়ী জুলিয়ান তার সুন্দরী কন্যাকে রডারিকের দরবারে রাজকীয় প্রশিক্ষণের জন্যে প্রেরণ করেন। কিন্তু রাজা রডারিক এসব শিক্ষার্থীদেরকে নিজের ভোগ ও বিলাশে ব্যবহার করতেন। তিনি জুলিয়ানের কন্যাকেও ধর্ষণ করেন। জুলিয়ান একথা জানতে পেরে রাজা রডারিকের সামনে নত হয়ে বলেন, “পরবর্তীতে আমি যখন স্পেনে আসবো, আমি শপথ করে বলছি, আমার সাথে কিছু বাজপাখি নিয়ে আসবো যা মহামান্য রাজা পূর্বে কখনো দেখেননি।”  

এরপর তিনি মরক্কোর মুসলিম গভর্নর মুসা বিন নুসাইরের দরবারে গিয়ে রাজা রডারিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন এবং স্পেন আক্রমণের আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু মুসা বিন নুসাইর জুলিয়ানকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তাই তিনি প্রথমে এতে সায় দেননি। এরপর জুলিয়ান রাজা রডারিক কর্তৃক নিজ কন্যার ধর্ষিতা হবার কথা প্রকাশ করেন। এবার মুসা বিন নুসাইর রাজা রডারিককে শায়েস্তা করতে রাজি হন এবং তারিক বিন জিয়াদকে এই অভিযানের সেনাপতি নিযুক্ত করেন। তারিক বিন জিয়াদ ৭ হাজার বার্বার সৈন্য নিয়ে স্পেনের উপকূলে অবতরণ করেন। কথিত আছে, সমুদ্র থেকে উপকূলে অবতরণ করার পর তিনি জাহাজগুলো আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেবার নির্দেশ দেন এবং এক জ্বালাময়ী বক্তৃতায় বলেন, “যুবকেরা, তোমাদের সামনে শত্রু আর পেছন সমুদ্র। তোমাদের জন্য এখন যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা কিংবা শাহাদাতের পেয়ালা পান করা ছাড়া তৃতীয় আর কোনও পথ খোলা নেই।” তার এই ভাশনে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুসলিম সৈন্যরা জীবন বাজি রেখে ভিসগথের কয়েকটি স্থানে প্রায় বিনা বাধায় জয়লাভ করেন। রডারিক তার বিখ্যাত সেনাপতি থিওডমীরকে (Theodomir) মুসলিম বাহিনির মোকাবিলার জন্য প্রেরণ করেন। কিন্তু থিওডমীর বারবার পরাজিত হন এবং আরো সৈন্য নিয়ে রাজাকে এগিয়ে আসার জন্য লিখেন। প্রায় এক লক্ষ বাহিনী নিয়ে রাজা এগিয়ে আসেন। মুসা বিন নুসাইর এ খবর পেয়ে তারিক বিন জিয়াদের সাহায্যার্থে আরো ৫ হাজার সৈন্য পাঠান। মোট ১২ হাজার সৈন্য এক লক্ষ খৃষ্টান সৈন্যকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। মুসলিম বাহিনী এভাবে অগ্রসর হয়ে প্রায় পুরো স্পেন জয় করেন এবং এর নামকরণ করেন “আন্দালুসিয়া”।

ঐতিহাসিক গিবন লিখেছেন, “মুসা ইবনে নুসাইর একবার ফ্রান্সের এক পাহাড়ের চূড়ায় চড়ে পুরো ফ্রান্সকে পর্যবেক্ষণ করে বললেন, তিনি আরব সৈন্যদের তার বাহিনীতে শামিল করে ইউরোপকে বিজয় করে কন্সট্যান্টিনোপোল পৌঁছবেন এবং সেখান হতে নিজ দেশ সিরিয়াতে প্রবেশ করবেন।”

কিন্তু সিরিয়ায় উমাইয়া খলিফার নির্দেশে তাদের অগ্রাভিযান থামিয়ে দিতে হয়। তা না হলে হয়ত আজ ইউরোপের ইতিহাস অন্যভাবে লিখতে হত। তাইতো ঐতিহাসিক গীবন লিখেছেন, “যদি ঐ মুসলমান জেনারেল সম্মুখে অগ্রসর হবার সুযোগ পেতেন, তাহলে ইউরোপের স্কুলে ইঞ্জিলের পরিবর্তে কুরআন পড়ানো হতো এবং আল্লাহর একত্ববাদ ও মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) রিসালাতের সবক দেওয়া হতো। আর আজকে রোমে পোপের পরিবর্তে শায়খুল ইসলামের হুকুম কার্যকর হতো।”

৮০০ বছর পর মুসলমানদের করুন বিদায়

মুসলমানগণ আন্দালুসিয়ায় আট’শ বছর পর্যন্ত শাসন কার্য চালায়। এ সময়ে তারা এখানে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতা-সংস্কৃতির অতুলনীয় প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত করে। তারা এ ভূখন্ডকে পৃথিবীর সর্বাদিক উন্নত ভূখন্ডে পরিণত করেন। কিন্তু একাদশ শতাব্দির শেষের দিকে শুরু হয় মুসলমানদের নৈতিক অধঃপতন। গান-বাজনা, নৃত্য, নারী এবং অমুসলিম সংস্কৃতির প্রতি প্রলোভন মুসলমানদের নৈতিক অবক্ষয়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক অধঃপতন ডেকে আনে। এ সময় মুসলমানগণ সেখানে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হতে থাকে এবং নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ আর হানাহানিতে লিপ্ত হয়। ক্রুসেডার খৃষ্টানরা এমন মোক্ষম সুযোগেরই যেন অপেক্ষায় ছিল। দুর্বল শাসন ব্যবস্থার পরও মুসলমানগণ আরো প্রায় ২০০ বছর সেখানে নিজেদের শাসন কায়েম রাখতে পেরেছিলেন।

অবশেষে ১৪৯২ খৃষ্টাব্দে খৃষ্টান রানী ইসাবেলা আর তার স্বামী ফার্ডিন্যান্ড মিলে স্পেন থেকে মুসলমানদের বিতাড়িত করে এবং মুসলমানদের সামনে দুটো পথ খোলা রাখে। একঃ ধর্মান্তরিত হওয়া এবং দুইঃ মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। অনেকে তাদের এ প্রস্তাবে জীবন বাঁচাতে খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করে, তবে মনে মনে ইসলাম আঁকড়ে থাকে। যারা ধর্মান্তরিত হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, তাদেরকে মসজিদে আশ্রয় নিতে বলা হয় এবং এর দরজা বন্ধ করে আগুন দিয়ে সবাইকে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। যেমনটি আজকের বৌদ্ধরা করছে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ক্ষেত্রে। এ সময় অনেক মুসলমানকে সাগরে ডুবিয়েও হত্যা করা হয়। নৃশংসতার যে রূপ বিশ্ববাসি তখন অবলোকন করেছে তা এর আগে পৃথিবীর মানুষ খুব কমই দেখেছে।

যেসব মুসলমান জীবন বাঁচাতে খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিল, তাদের পরিণতি অবশেষে চরম আকার ধারণ করে ১৬০০ শতকের শুরুতে। খৃষ্টান শাসকগণ তাদেরকে হত্যা কিংবা দেশ ত্যাগের মাধ্যমে স্পেনকে মুসলিম মুক্ত করে। মুসলমানরা প্রায় ৮০০ বছর ধরে যে দেশকে পৃথিবীর মধ্যে উন্নতির শিখরে নিয়ে গিয়েছিলেন, সে দেশ মুসলমানদের থেকে চিরতরে ছিনিয়ে নেয়া হল মুসলমানদের মুসলমানিত্ব চলে যাবার কারণে।

[ভালো লেগে থাকলে লেখাটি কপি করে আপনাদের টাইমলাইনে পোষ্ট করতে পারেন। আর দয়া করে নিচের কমেন্ট বক্সে আপনাদের মতামত জানাতে ভুলবেন না।]

পোষ্টটি ভালো লেগে থাকলে আপনার মূল্যবান মতামত জানান প্লিজ!
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Comment